আজ : রবিবার, ৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১৮ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং, ৮ই রবিউল-আউয়াল, ১৪৪০ হিজরী, রাত ১২:০০,

খুলনায় নির্ভার আ.লীগ, শঙ্কায় বিএনপি!

  • খুলনা সিটি নির্বাচন কাল
  • ২৩৪ কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ
  • ভোট ডাকাতি ও নাশকতার পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
  • বিএনপির দেড় শ নেতা কর্মী গ্রেপ্তার বলে দাবি
  • নগরীতে নেমেছে ১৬ প্লাটুন বিজিবি

প্রচারণা শেষ। রাত পোহালেই ভোট। খুলনা সিটি নির্বাচনে হারতে পারেন-এমন ভাবনা নেই আওয়ামী লীগের মেয়র পদপ্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেক বা তাঁর অনুসারীদের। ভোটে জিতে গেছেন, শেষ সময়ে এসে এমনই মনোভাব এখানকার সরকারি দলের নেতাদের।

অন্যদিকে বিএনপির মেয়র পদপ্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু ও তাঁর অনুসারীদের মনে নানা শঙ্কা। শেষ সময়ে সরকারি দল কোনো ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা কূটকৌশলের আশ্রয় নেয় কি না, তা নিয়ে তাঁরা উদ্বিগ্ন। এ জন্য ব্যালট পেপার ভোটের দিন ভোরে কেন্দ্রে পাঠানোর অনুরোধ জানিয়েছেন বিএনপির প্রার্থী।

তবে এটা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. ইউনুচ আলী। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, সকাল আটটায় ভোট গ্রহণ শুরু। ওই দিন সকালে ব্যালট পেপার পাঠিয়ে ভোট নেওয়া কীভাবে সম্ভব?

সব কেন্দ্রে বিএনপির প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট যেতে পারবেন কি না, ভোটাররা নির্ভয়ে কেন্দ্রে যাওয়ার পরিবেশ পাবেন কি না-তা নিয়েও শঙ্কা আছে বিভিন্ন মহলে। বিএনপির নেতারা বলছেন, পুলিশের ধরপাকড়ের কারণে নেতা-কর্মীরা ঘরে ঘুমাতে পারছেন না। অনেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন। অনেকে ভয়ের মধ্যে আছেন। পোলিং এজেন্ট ঠিক করছেন যেসব থানা পর্যায়ের নেতা, তাঁরাও দৌড়ের ওপর আছেন।

গতকাল রোববার ভোর পর্যন্ত গ্রেপ্তার হওয়া নেতা-কর্মীর সংখ্যা দেড় শ ছাড়িয়েছে বলে দাবি দলটির। কাল সকালে দলটির পক্ষ থেকে ৩৯ জন নেতা-কর্মীর নাম-পরিচয় গণমাধ্যমকে দেওয়া হয়েছে, যাঁদের মধ্যে গতকাল রোববার ১৩, শনিবার রাতে ৯ এবং শুক্রবার ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানানো হয়।

অবশ্য পুলিশ বলছে, তারা মামলার আসামি ধরছে। আর এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালুকদার খালেক প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশ অপরাধীদের ধরছে বলেই নির্বাচনের পরিবেশটা সুষ্ঠু আছে।

২৩৪ কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ
মোট ২৮৯টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ২৩৪ টিকেই ঝুঁকিপূর্ণ (কমিশনের ভাষায় গুরুত্বপূর্ণ) ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। মাত্র ৫৫টি সাধারণ বা ঝুঁকিমুক্ত কেন্দ্র আছে। গতকাল নগরীতে নেমেছেন ১৬ প্লাটুন (প্রতি প্লাটুনে ৩০ জন) বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্য।

এ নির্বাচন এবার কয়েকটি কারণে কিছুটা ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। এই প্রথম দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হতে যাচ্ছে। জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দুই দলই জেতার জন্য মরিয়া। দুই দলই এমন দুজনকে প্রার্থী করেছে, যাঁরা শুরুতে এই ভোটে আসতে চাননি। দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তাঁদের প্রার্থী হতে বাধ্য করেছে। দুজনই শক্ত প্রার্থী হিসেবে পরিচিত।

যে কারণে আওয়ামী লীগ নির্ভার
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, শুরুতে বিএনপি ছিল কিছুটা নির্ভার। ধরে নিয়েছিল তারা এগিয়ে আছে অনেক। আর সরকারি দল আওয়ামী লীগ কিছুটা শঙ্কায় ছিল। তাই শঙ্কা কাটাতে সরকারি দল সর্বতোভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছে শুরু থেকে। এখন শেষ সময়ে এসে আওয়ামী লীগ জেতার ব্যাপারে আশাবাদী হয়ে উঠেছে। দলটি ইতিমধ্যে তাদের প্রার্থীর পক্ষে বিভিন্ন পেশাজীবীদের মাঠে নামাতে সক্ষম হয়েছে। খুলনার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের একটা অংশও সরকারি দলের প্রার্থীর পক্ষে গণসংযোগ করেছেন। বিভিন্ন জেলা থেকে আসা বড় একটা জনগোষ্ঠী এ শহরের ভোটার। তাদের পক্ষে টানতে ওই সব জেলা-উপজেলার কল্যাণ সমিতিকেও নামিয়েছে আওয়ামী লীগ।

প্রশাসনের কোনো কোনো অংশকে কাজে লাগিয়ে এবং নানা কৌশলে বিএনপির কয়েকটি ভোটব্যাংকের ভোটারদের দ্বিধায় বা কোনো কোনোটাকে পক্ষে আনতে পেরেছে বলে জানা গেছে। বিএনপি-সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীদের মধ্যে অন্তত সাতজনকে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থীর পক্ষে আনা সক্ষম হয়েছে বলেও তালুকদার খালেকের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র দাবি করেছে। এর মধ্যে একজন প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষাবলম্বন করেছেন। তিনি হলেন ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী শেখ হাফিজুর রহমান। তিনি খুলনা মহানগর বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বাকি ছয়জনের বিষয়ে জানতে চাইলে নগর বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ একজন নেতা প্রথম আলোকে বলেন, কয়েকজনকে ভয়-ভীতি দেখানো হয়েছে। কাউকে কাউকে অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ফোন করেছেন। ফলে তাঁরা চুপসে গেছেন। এমন কয়েকজন বিএনপির প্রার্থীর কাছে বার্তাও পাঠিয়েছেন যে, তাঁরা প্রচণ্ড চাপে আছেন।

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, গত সিটি নির্বাচনে তালুকদার আবদুল খালেক বিএনপির প্রার্থীর কাছে পরাজিত হওয়ার পেছনে দলের অনৈক্য এবং হেফাজতে ইসলাম বড় কারণ ছিল। এবার শুরুতেই দলীয় ঐক্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। হেফাজত বিষয়েও এবার উদ্বেগ নেই বলে প্রথম আলোকে জানিয়েছেন তালুকদার আবদুল খালেক। গত রাতে নগরীর একটি হোটেলে আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে হেফাজতের কয়েকজন নেতার আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।

এখানে বিহারিদের যে ভোটব্যাংক, সেটাকেও পক্ষে রাখার চেষ্টা হচ্ছে। বকেয়া বেতন পরিশোধের ব্যবস্থা করে পাটকল শ্রমিকদের অসন্তোষ দূর করার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলেও জানা গেছে।

অতীতে দলীয় কাউন্সিলর প্রার্থীরা নিজের ভোটের বিষয়ে সচেষ্ট থাকত। ফলে এমনও হয়েছে কাউন্সিলর জিতলেও দলের মেয়র প্রার্থী সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রে কম ভোট পেয়েছেন। এবার দলের কঠোর নির্দেশনা থাকায় কাউন্সিলর প্রার্থীরা আগে মেয়রের ভোট, তারপর নিজের ভোট চাইছেন।

বিএনপির শঙ্কার কারণ
গাজীপুর নির্বাচনের ওপর আদালতের স্থগিতাদেশ আসার পর থেকে বিএনপির নেতারা ধরে নিয়েছেন যে খুলনায় জেতার জন্য সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা করবে। এ জন্য কোনো না কোনো কৌশল (তাদের ভাষায় ইঞ্জিনিয়ারিং) করবে। কিন্তু সেটা কী, তা তাঁরা ধরতে পারছেন না। একজন গুরুত্বপূর্ণ বিএনপি নেতা বলেন, তাঁর ধারণা, জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে এই নির্বাচনে সরকারি দল কেন্দ্রে গোলমাল করে দুর্নাম নিতে চাইবে না। কোনো কারণে রাতে যাতে কিছু না হয়, সে জন্য ভোটের দিন ভোরে ব্যালট পেপার কেন্দ্রে পাঠানো অনুরোধ করেছেন বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর একটা শঙ্কা হলো, যেসব ওয়ার্ডে বিএনপির ভোট বেশি, সেসব ওয়ার্ডের বিভিন্ন স্থানে ককটেল ফাটিয়ে আতঙ্ক তৈরি করা হতে পারে, যাতে ভোটাররা কেন্দ্রে না যান। এর মধ্যে ১১, ১৩, ১৫, ২২, ২৭, ২৮, ২৯ ও ৩১ নম্বর ওয়ার্ডকে লক্ষ্যবস্তু করার আশঙ্কা করছেন। খালিশপুর ও দৌলতপুর নিয়ে বেশি শঙ্কিত তিনি।

বিএনপির নেতাদের অভিযোগ, মঈন জমাদ্দার, এস এম হাফিজুর রহমান ও ওয়াজেদ আলমের মতো নগরীর কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী এবং সাবেক চরমপন্থী নেতা গাজী কামরুল সরকারি দলের প্রার্থীর পক্ষে মাঠে নেমেছেন। এটাও আতঙ্ক ধরানোর চেষ্টার অংশ বলে মনে করছেন তাঁরা। এ ছাড়া যেসব কেন্দ্রে বিএনপির ভোট বেশি, সেসব কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর প্রার্থীরা গোলমাল বাধিয়ে ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারেন।

বিএনপির নেতারা বলেছেন, ভোটার উপস্থিতি বাড়ানো হচ্ছে তাঁদের জন্য চ্যালেঞ্জ। থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতারা সাধারণত দলীয় সমর্থক ভোটারদের কেন্দ্রে আনার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু এবার তো তাঁরা গ্রেপ্তার এড়াতে ঘরেই থাকতে পারছেন না।

পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
গতকাল প্রচারের শেষ দিনেও প্রধান দুই দল পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেছে। সকালে বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ করেন, সরকারি দল খালিশপুর ও দৌলতপুরে ব্যাপক ভোট ডাকাতির প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিএনপির কর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাঁদের পরিবারের সদস্যদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে, যেন কেউ ভোটকেন্দ্রে না যান।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেক সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘ওরা হারলে ভোট ডাকাতির অভিযোগ করে, জিতলে কিছু বলে না। ওদের কথা আমি গুরুত্ব দিই না। অবাধ ও সুষ্ঠু ভোটের যে পরিবেশ দরকার, সেটা বিরাজ করছে।’

আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়ক এস এম কামাল হোসেন দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ করেন, বিভিন্ন জায়গা থেকে জামায়াত-শিবিরের ক্যাডার জড়ো করে ভোটের দিন নাশকতার পরিকল্পনা করছে বিএনপি।

রিটার্নিং কর্মকর্তা মো ইউনুচ আলী প্রথম আলোকে বলেন, অবাধ ও সুষ্ঠু ভোট করার জন্য তাঁদের যথেষ্ট প্রস্তুতি আছে। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ (ঝুঁকিপূর্ণ) কেন্দ্রের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে ২৪ জন পুলিশ ও আনসার। সাধারণ কেন্দ্রগুলোর প্রতিটিতে থাকবে ২২ জন করে। এর বাইরে পুলিশের ১১টি স্ট্রাইকিং দল (প্রতিটিতে ১০ জন করে), ৭০টি ভ্রাম্যমাণ দল (প্রতিটি ৭ জন করে), ১৬ প্লাটুন বিজিবি, র‍্যাবের ৩২টি ভ্রাম্যমাণ দল, ৩১ জন নির্বাহী হাকিম এবং ১০ জন বিচারিক হাকিম দায়িত্ব পালন করবেন। সবাই নিজ নিজ দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করলে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে বলে তিনি আশাবাদী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

রাজশাহীর মেয়র প্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন!

Share নজরুল ইসলাম তোফা:: রাজশাহীকে বদলে দেয়ার অঙ্গীকার নিয়ে ইতোমধ্যেই ক্ষমতাশীন দলের নেতা এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন সহ অনেক নেতা কর্মীরা মিলিত হয়ে যেন জয়ের হিসাব নিকাশ কষে নির্বাচনী প্রচারণায় চালিয়ে যাচ্ছেন। রাজশাহী মহা ...

নাঙ্গলকোট রাইটার্স এসোসিয়েশনের ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত

Share স্টাফ রির্পোটার: লেখক-সাহিত্যিকদের প্রিয় সংগঠন নাঙ্গলকোট রাইটার্স এসোসিয়েশনের উদ্যোগে লাকসাম পৌরশহরস্থ স্বদেশ রেস্তোরা মিলনায়তনে ইফতার মাহফিল ও দোয়ার আয়োজন অনুষ্ঠিত হলো ১ জুন শুক্রবার। সংগঠনের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আফজাল হোসাইন মিয়াজীর প্রাণবন্ত উপস্থাপনায় ও সংগঠনের ...