আজ : শনিবার, ৬ই শ্রাবণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ২১শে জুলাই, ২০১৮ ইং, ৭ই জিলক্বদ, ১৪৩৯ হিজরী, সকাল ১১:৫৪,

মহান একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে দৈনিক সোনালী দেশ এর বিশেষ ক্রোড় পত্র

মূল প্রবন্ধ-

ভাষা নিয়ে বিশিষ্ট্য জনদের ভাবনা

রহিমা আক্তার মৌ[
১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবে বাংলাসহ আরো ৪টি প্রদেশের মুসলমানেরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল মুসলমান প্রধান রাষ্ট্র সমূহ গঠন করা হবে। আর এ রাষ্ট্র সমূহের অন্তর্ভূক্ত ইউনিটগুলো হবে স্বায়ত্তশাসিত এবং সার্বভৌম। কিন্তু ১৯৪৬ সালে দিল্লিতে অধিবেশন বসলে সব উলোট পালট হয়। বলা হয় শব্দটি স্টেটস হবে না, হবে ষ্টেট। ভুল করে টাইপ করার সময় একটা এস এসে বসে গেছে। তার মানে ভারতের ম্ষুলিম প্রধান অঞ্চলগুলো নিয়ে হবে মাত্র একটি রাষ্ট যার নাম পাকিস্তান। হিন্দু-মুসলমানদের ভৌগোলিক অবস্থানগত জন সরকার নিরিখে ভারতীয় উপমহাদেশ বিভক্ত হয় দুটি অংশে ভারত ও পাকিস্তান। আর পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার আগেই পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা প্রসঙ্গে বিতর্ক শুরু হয়।
উর্দুর পক্ষে উসকানি মুলক বক্তব্য দিয়ে বাঙ্গালীর ভাষা সংগ্রামের সূত্রপাত ঘটান আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়া উদ্দিন আহমদ। তার বক্তব্যের লিখিত প্রতিবাদ জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। বাঙ্গালি জাতির এক অসাম্প্রদায়িক সহিষ্ণু চেতনার পথে লড়াই শুরু হয় এখান থেকেই। ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা ‘বাংলা না উর্দু’ শিরোনামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে তমদ্দুন মজলিস।
১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রথম অধিবেশনেই প্রস্তাব করেন। পরিষদের কার্যক্রম ইংরেজি ও উর্দু ভাষার সাথে বাংলা ভাষাতেও পরিচালিত হোক, তাঁকে সমর্থন করেছিলেন সদস্য রাজকুমার চক্রবর্তী।
১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ জিন্নাহ ঢাকায় এলেন। যুক্তি আর বাস্তবতাকে মূল্যায়ন না করে মগজে শুধু স্লোগান রাখলেন, ২১ মার্চ রেসকোর্স মাঠে ইংরেজিতে বক্তৃতা করে বলেছিলেন, “তোমাদের পরিস্কার বলে দিচ্ছি পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হবে উর্দু আর অন্য কোন ভাষা নয়। কেউ যদি এর বিরোধিতা করে মনে করতে হবে যে হচ্ছে রাষ্ট্রের শত্রু। ২৪ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন উৎসবে ও তিনি একই প্রস্তাব করেন। সেদিন-ই জিন্নার প্রস্তাবের বিপক্ষ নেয় এবং না সুচক শব্দ বের হয়।
মাতৃভাষা বাংলাকে মর্যাদা দেয়ার জন্য অনেক আন্দোলন হয়েছে। ১৯৪৮ সালে ২৬ ফেব্রুয়ারি হরতাল হয়েছে। মার্চ মাসের ১৩,১৪ তারিখেও ছিল হরতাল। ১৯৫২ সালের ৩০ জানুয়ারিতে ধর্মঘট ডাক দেওয়া হয়। ৩১ জানুয়ারিতে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহবানে সর্বদলীয় সমাবেশ হয়েছে। ৪ ফেব্রুয়ারি ছাত্রদের হরতাল হয়েছে। ২১ ফেব্রুয়ারি প্রাদেশিক পরিষদের রাজেট অধিবেশন, তখন রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি পেশ করার দিন ধার্য হয়। কিন্তু নূরুল আমিন সরকার ২০ তারিখেই ১ মাসের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করে দিল।
২১ তারিখে দলে দলে ছাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গনে উপস্থিত। ১৪৪ ধারা অমান্য হবে কিনা এ নিয়ে আগের দিন অনেক জটলা হয়। ১১ জন ছিল আইন অমান্য না করার পক্ষে আর ৩ জন ছিল অমান্য করার পক্ষে। কিন্তু ২১ তারিখের বেলতলার ছাত্র সভায় সাধারণ ছাত্ররা সম্মিলত ভাবে ১৪৪ ধারা অমান্য করে পথে বের হবার পক্ষে রায় দিল। ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার কারণে পুলিশের কাদাঁনে গ্যাস আর বুলেটের সামনে পড়ে ছাত্র জনতা। ঘটনাস্থলে শহীদ হন আব্দুল জব্বার ও রফিক উদ্দীন আহমেদ। আহত হন আরো ১৭ জন। এর পর পরই শহীদ হন আবুল বরকত। ২২ তারিখ গায়েবানা নামাজ শেষে প্রতিবাদ মিছিল বের হলে সেখানেও পুলিশের গুলি চলে সেখানে শহীদ হন শফিউর রহমান।
১৯৫৬ সালের মার্চ মাসে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান প্রনীত হয়। পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্র ভাষা হিসাবে বাংলা ভাষা স্বীকৃতি লাভ করে।
স্বীকৃতি পাওয়া বাংলা ভাষা নিয়ে আমাদের বিশিষ্ট্য জনেরা বিভিন্ন ভাবে মত প্রকাশ করেছে-

“রাষ্টভাষা আন্দোলন ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি নয়, মুলতঃ শুরু হয়েছিল ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ। এই দিনই বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে করাচীতে অনুষ্ঠিত জাতীয় পরিষেদের অধিবেশনে উর্দুকে পাকিস্তানের এক মাত্র রাষ্ট্র ভাষা করার জন্য প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। এক মাত্র কুমিল্লার শ্রী ধীরেন্দ্র নাথ দত্তই উদুর্কে একমাত্র রাষ্ট ভাষা করার প্রতিবাদ করেন এবং উর্দুর সাথে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্র ভাষা করার দাবি জানান। কোন বাঙ্গালি মুসলমান প্রতিবাদ করেনি। এটা লজ্জা জনক ইতিহাস। ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোল শুধুমাত্র ভাষার আন্দোলন ছিল না। বাঙ্গালির অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক তথা সার্বিক স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন এর সাথে জড়িত ছিল।” কথা গুলো বলেছেন বঙ্গ বন্ধুশেখ মুজিবুর রহমান।
তিনি আরো বলেন-
“ভাষা আন্দোলনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে আমি ঘোষনা করছি, আমার দল ক্ষমতা গ্রহনের দিন থেকেই সকল সরকারী অফিস, আদালত ও জাতীয় জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে বাংলা চালু করবে। এ ব্যাপারে আমরা পরিভাষা সৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করবোনা। কারন তাহলে সর্বক্ষেত্রে কোনদিনই বাংলা চালু করা সম্ভবপর হবে না। এ অবস্থায় হয়তো কিছু কিছু ভুল হবে। কিন্তু তাতে কিছু যায় আসেনা। এ ভাবেই আমাদের অগ্রসর হতে হবে।” (১৯৭১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি আজাদ, সংগ্রাম, ইত্তেফাক সুত্রে)।
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম মাতৃভাষা চর্চার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে বলেছেন-
“আমাদের জাতীয় জীবনে সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি এই যে, আমরা সবচেয়ে কাছের মানুষটিকেই সবচেয়ে কম জানি। আমরা ইংরেজদের কৃপায় ইংরাজি, গ্রিক ভাষা জানি, ইতিহাস জানি, তাদের সভ্যতার খবর নিই, কিন্তু আমারই গায়ে লাগিয়ে সে প্রতিবেশীর ঘর তারই কোন খবর রাখিনে বা রাখার চেষ্টা করিনে। বরং ঐ না জানার গর্ব করি বুক ফুলিয়ে। কোন মুসলমান যদি তার সভ্যতা ইতিহাস ধর্ম শাস্ত্র কোন কিছু জানতে চায় তাহলে তাকে আরবি ফার্সি বা উর্দুর দেয়াল টপকাবার জন্য আগে ভাল করে কসরৎ শিখতে হবে। ইংরেজী ভাষায় ইসলামের ফিরিঙ্গ রূপ দেখতে হবে। কিন্তু সাধারন মুসলমান ভাল করে বাংলা ভাষাও শেখে না, তার আবার আরবি ফার্সি। কাজেই ৯-মন তেল ও আসে না, রাধাও নাচেনা। আর যাঁরা ও ভাষা শেখেন তাঁদের অবস্থা “পড়ে ফার্সি বেচে তেল” আর তাদের অনেকেই শেখেনও সেরেফ হালুয়া রুটির জন্য।

কয়জন মৌলানা আমাদের মাতৃভাষার পাত্রে আরবি ফার্সির সম্দ্রু মন্থর করে অহত অমৃত এনে দিয়েছেন জানিনা। সে অহত তারা একা পান কোরেই ‘খোদার খাসি ’ হয়েছেন। কিন্তু এ যোদার যামি দিয়ে আর কতদিন চলবে ? তাই আপনাদের অনুরোধ করতে এসেছি এবং আপনাদের মারফতে বাংলার সকল চিন্তাশীল মুসলমানদেরও অনুরোধ করছি, আপনাদের শক্তি আছে, অর্থ আছে যদি পারেন মাতৃভাষায় আপনাদের সাহিত্য জ্ঞান-বিজ্ঞান-ইতিহাস সভ্যতার অনুবাদ ও অনুশীলনের কেন্দ্রভুমি যেখানে হোক প্রতিষ্ঠা করুন। (“মুসলিম সংস্কৃতির চর্চা” শীর্ষক অভিভাষন-সুত্রে)
আমাদের ভাষা সমস্যা শিরোনামে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন-
“আমরা বঙ্গ দেশবাসী” আমাদের কথা বার্তার, ভয়-ভালোবাসার চিন্তা কল্পনার ভাষা বাংলা। তাই আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। দুঃখের বিষয়, জ্যামিতির স্বতঃসিদ্ধের ন্যায় এই সোজা কথাটিকেও আমাদের মধ্যে এক সম্প্রদায়কে বুঝাইয়া দিলেও তাঁহারা জোর করিয়া বুঝিতে চাহেন না। তাই মাঝে মধ্যে আমাদের মাতৃভাষা কি কিংবা কি হইবে তাহার আলোচনা সামরিক পত্রিকা দিতে দেখিতে পাওয়া যায়। মাতৃভাষা ব্যতীত আর কোন ভাষা কানের ভিতর দিয়া মরাম পশিয়া পরান আকুল করে? মাতৃভাষা ছাড়া আর কোন ভাষার ধ্বনির জন্য প্রবাসীর কান পিয়াসী থাকে ? মাতৃভাসা ছাড়া আর কোন ভাষায় কল্পনা, সুন্দরী তাহার মনমজান ভাবের ছবি আঁকে ? কাহার হৃদয় এত পাষান যে মাতৃভাষার অনুরাগ তাহাতে জাগে না? পৃথিবীর ইতিহাস আলোচনা করিয়া দেখ, মাতৃ ভাষার উন্নতি ব্যতীত কোনও জাতি কখনও কি বড় হইতে পারিয়াছে ? আরব পারস্যকে জয় করিয়াছিল। পারস্য আরব ধর্মের কাছে মাথা নিচু করিয়াছিল। কিন্তু আরবের ভাষা লয় নাই শুধু লইয়াছিল তাহার ধর্মভাবে আর কতকগুলি শব্দ।” তিনি আরো বলেছেন-
“সেদিন অতি নিকটে যেদিন বাংলা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ভাষার স্থান অধিকার করবে। বিদেশীর ভাষার সাহায্যে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চ্চার মতন সৃষ্টি ছাড়া প্রথা কখনও টিকিতে পারে না। যতদিন পর্যন্ত তাহা না হইতেছে, ততদিন পর্যন্ত আমাদিগকে একটি সময়পযোগী শিক্ষা প্রণালী অবলম্বন করিতে হইবে।”

“মাতৃভাষা” শিরোনামে ভাষা আন্দোলনের নাট্য দলিলের নাট্যকার মুনীর চৌধুরী বলেছেন,,,,,,
“যার যা প্রানের ভাষা। সেটাই তার মাতৃভাষা। কার মাতৃভাষা খিস্তি, কারও মিছরি। আমি নিজেও এমন অনেককে জানি, যাঁদের মাতৃভাষা ঘরে আঞ্চলিক বুলি, অফিসে ইংরেজী, প্রনয়-নিবেদনে বিশুদ্ধ বাংলা, রোষ প্রকাশ অশুদ্ধ উর্দু। আমার মাতৃভাষা কি? বাংলা ভাষা সমগ্র বাংলা ভাষা। বিচিত্র রূপিনী বাংলা ভাষা। অভিধান আছে ষোড়শ রমনী মাতৃসন্ধোধনী যোগ্য। শ্বশ্রু থেকে তনয়, গর্ভধারিনী থেকে পিতৃরমনী। ষোল নয়, আমার মাতৃভাষার ষোল শত রূপ। তার সব পঙ্খিনীর সহচরী। আমার মাতৃভাষা তিব্বতের গৃহাচারী মনসার দর্পচুর্ণ কারী, আরাকানের রাজ সভার মনিময় অলংকার, বরেন্দ্র ভুমির উদাস আহবান। মাইকেল- রবীন্দ্রনাথ- নজরুল ইসলাম আমার মাতৃভাষা। আমার মাতৃভাষা বাংলা ভাষা।”
‘বাংলা ভাষার ক্রম বিকাশ’ শিরানামে মুহাম্মদ এনামুল হক বলেছিলেন-
“ভাষার ক্রমবিকাশের গতি ও প্রকৃতি আলোচনা করলে সহজেই বুঝতে পারা যায়।” এই বৈজ্ঞানিক সত্যটি যে শুধু জীব জগতের প্রতি প্রযোজ্য তা নয়। ভাষার ক্ষেত্রেও এই সত্য সমভাবে প্রযোজ্য। পারিপাশ্বির্ক তার সাথে যুদ্ধ করে কোন কোন দুর্বল ভাষা আজও স্বগৌরবে বেঁছে আছে। পৃথিবীর এ ভাষাগুলোকে প্রায়ই জীবিত ভাষাও বলা হয়। চর্যাপদের ভাষা যে বাংলা, এখন সে বিষয়ে আর কোন সন্দেহ নাই। এ বাংলা যে বাংলা ভাষার প্রাথমিক অবস্থা, তাও সর্বস্বীকৃত সত্য। এতৎসত্ত্বেও, হিন্দী ভাষী ও সৈথিলী ভাষী। উড়িয়াভাষী ও অহমিয়া ভাষীদের কেহ কেহ চর্যাপদকে তাদের ভাষার আদি নিদর্শন বলে দাবী তুলেছেন।

চর্যাপদের ভাষা, ছন্দ, ভাব ও সুর সবই অনুসৃত হয়েছে বাংলাদেশে। খ্রীষ্টীয় চতুর্দশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে অথবা মধ্য ভাগে রচিত অনন্ত বডু চন্তহীদাসের বিখ্যাত গ্রন্থ “শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন” পরবর্তী যুগের সহজিয়ো বহন করছে। ‘চর্যাপদে’ যে বঙ্গ ভাষার শৈশব কাল কেটেছে, শ্রীকৃষ্ণ কীতনে’ তা কৈশোরে পদার্পন করেছে এবং শাহ মুহাম্মদ সগীরের ‘ইউসুফ জুলেখার’ তা যৌবনুথ হয়েছে। অতপর ‘মন সামঙ্গল’ ‘ধর্মমঙ্গল’ চন্ডী মঙ্গল’ ‘রামায়ন’ মহাভারত প্রভৃতির ভাষায় বাংলা ভাষা যৌবন প্রাপ্ত হয়েছে।”
‘বাংলা ভাষা আন্দোলন’ সম্পর্কে রফিকুল ইসলাম লিখেছিলেন-
“এ অঞ্চল বাঙালি শাসিত ছিল কদাচিৎ। বহিরাগত ভাষা রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত শত বছর ধরে, ফলে স্বদেশী ভাষা সুযোগ পায়নি বিকাশ লাভের। ৪৭ সালে দেশ বিভাগ এবং উপমহাদেশ দু’টি স্বাধীন রাষ্ট্র স্থাপনের ফলে দেশীয় ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা লাভের সুযোগ আসে কিন্তু তখনও বাংলা ভাষা বঞ্চিত হয়।”
মোহাম্মদ মনিরু জ্জামান লিখেছিলেন-
‘সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন’ শিরোনামে লেখা, যেখানে তিনি লিখেছিলেন- কারা বাংলা ব্যবহার করছেন এবং কারা করছেন না। আমাদের দেশে উৎপাদনে যাঁরাই নিয়োজিত আছেন- তাঁরা সকলেই বাংলা ব্যবহার করছেন আর যারা সৃজনশীলতা ও উৎপাদনে যুক্ত নন তারা বাংলা ব্যবহার করছেন না। কবি সাহিত্যিক শিল্পী এবং বিজ্ঞানী ও পন্থিদের মধ্যে যাঁরা সৃজনশীল তারা বাংলা ব্যবহার করছেন। তাছাড়া সম্পদ উৎপাদনে যাঁরা নিয়োজিত- অর্থাৎ শ্রমিক ও কৃষক তাঁরা সর্বদাই বাংলা ব্যবহার করছেন। এর বাইরে যারা না সৃজনশীল না সম্পদ উৎপাদনে সমর্থ- তাঁরা- কেবল তাঁরাই বাংলা ব্যবহার করছেন না।
বস্তুতঃ পক্ষে তাঁরা এক ধরনের পরাধীন মানসিকতায় ভুগছেন এবং এর একটা পটভুমি আছে।
১৯৪৭ সালে ইংরেজদের বদলে যাঁরা শাসকের অসনে বসলেন তাঁরা শাসক সূলভ স্বভাবেই তাঁদের নিজেদের ভাষা উর্দু চাপিয়ে দিতে চাইলেন বাঙ্গালীর ঘাড়ে। কিছু ঐ ঘটনার আগে নব্য শাসকেরা একটা ভুল করে ফেলেছিলেন তাঁরা বাঙ্গালীকে বুঝিয়ে ছিলেন যে, ইংরেজ চলে গেলে বাঙ্গলীরা স্বাধীন হবে। কেননা তার আগে বাঙ্গালী স্বাধীনতা দেখেনি। তাই ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগষ্টের স্বাধীনতার পর আবার পরের ভাষার দাসত্বের প্রশ্ন উঠলে চাকুরী প্রার্থী বাঙ্গালীর কন্ঠে প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়েছিল। এর ফলে শিক্ষা, চাকুরী ও ব্যবহারিক জীবনে পরের ভাষার দাসত্ব থেকে মুক্তি এবং নিজের ভাষা ব্যবহারের স্বাধীনতা লাভ করে।

‘একুশের চেতনা আমার’ শিরোনামে মমতাজ উদ্দীন আহমেদ লিখে ছিলেন-
“আমার অশন, বসন, শয়ন, স্বপন সবার মধ্যেই আমার বাংলা ভাষা। বাংলা আমার মা আর বাংলা ভাষা আমার মায়ের ভাষা। যাকে কবি শ্রী মুধুসুধন বলেছেন- মাতৃভাষা। আগের কবিরা বলতো দেশী ভাষা। দুটোই ঠিক। মাতৃভাষা আর দেশী ভাষা, সবই আমার আপন ভাষা। আমার সঙ্গে আমার অস্তিত্বের সঙ্গে মিলে মিশে এমন হয়েছে যে, আমি ছাড়া ভাষা নেই আর ভাষা ছাড়া আমি নেই। মজার ব্যপার হল, দেব নির্ভর পন্ডিতের কথা বাঙ্গালিরা শোনেনি। যেন রাজাদের কৌলীন্য অত্যাচারে জর্জরিত নিন্ম বর্নের বাঙালিরা শাস্ত্রে ও ধর্মে জীবনের ব্যাথা খোঁজনি। খুঁজতে লোক জীবনাচরনের মধ্যে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গঠন। বিকাশ ও অগ্রগতির মধ্যে যে খোঁজা খুঁজির অজস্র প্রমান আছে। পাল রাজাদের পতনের সময় পেলাম বৌদ্ধ সহজযান পন্থার গান চর্যাগীতি, যেন রাজাদের পলায়নের পর পেলাম শেক শুভোদয়া, গীত গোবিন্দ, শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন, আর পাঠানদের যাবার কালে পেলাম যত মঙ্গল কাব্য। ধর্ম ঠাকুর আর কালুগাজী সত্য পীরের গান। মোঘলদের যাবার পর পেলাম বিদ্যা, সুন্দর, কবিগান ও পুঁথি কাব্য। দেবও রাজন্যবর্গের অনুশাসন ও পরি দর্শনার বাইরে এই হল বাংলা ও বাঙ্গালির জীবন পরিচয়। বাংলার ঐ এক কথা, আমার যা সত্য, যা প্রয়োজন এবং আনন্দ তার মধ্যেই আমার অধিবাস। যেখানে তুমি ইংরেজি আর তুমি পাকিস্তানী তোমাদের হুকুমে, ইঙ্গিতে ও দন্ডাদেশের ভয়ে আমি ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে ছলনা করতে পারব না।”

ভাষা বোধ ছিল বলেই চর্যাপদের ভুসুকু পা বলেন-
আমি ভুসুকু, বাঙ্গালী ভইলী। আর মধুসুদন ঠাট্টা করে বলেন আমি শুদ্ধ বাঙ্গালী নহি, আমি বাঙাল। ৬০ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছিলেন- আমরা হিন্দু মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশিসত্য আমার বাঙালি। মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী বলেছিলেন- বাংলা বাংলার পৌনে ষোল আনা লোকের মাতৃভাষা। ইহাতে হিন্দু মুসলমানের কোন পার্থক্য নেই। জগতে এমন কোন হাতির দৃষ্টান্ত দেখতে পাওয়া যায় না। যাহারা মাতৃভাষার সাহায্য ব্যতীত উন্নত সোপানে আরোহন করিতে সক্ষম হইয়াছে।’

সেলিনা হোসেন বলেছেন- “মাতৃভুমি ও মাতৃভাষাকে ভালো কে না বাসে ? এই ভালোবাসা মানুষের স্বভাবের মধ্যে এমন ভাবে মিশে আছে যে সংকটে পতিত না হওয়া পর্যন্ত মানুষ এ ভালবাসার কথা ভুলেই যায়। মাতৃ ভাষা ও মাতৃভুমির প্রতি ভালবাসার কথা মানুষকে মনে করিয়ে দেয় প্রয়োজনে মাতৃভাষার জন্য হৃদয়ের ফগ্লু ধারায় মাতা ভালবাসা থাকাই যথেষ্ট নয়। সে ভালবাসার প্রকাশ প্রয়োজন।
যোগাযোগ — ০১৯৭৬২৭২৭২১

 

 

 

কবিতায় একুশে ফেব্রুয়ারি

 

উড়াল
হাসনা হেনা

ভেতর বাহির ধূসর দিনের মেঘ
প্রচ্ছদ ভেঙে উড়াল দিচ্ছে
সান্ধ্য প্রার্থনার সুর!
.
লেবুগাছে লুটিয়ে পড়েছে জল মগ্নতার বেহাগ,
অতঃপর সন্ধ্যের হাত ধরে তুমুল বৃষ্টির খেলা!
তোলপাড় জানালায় বৃষ্টির ছাট
আমাকে হারিয়ে দিল
আকাশের মেঘছায়া-জলের ভাসান।
.
অতল রাত্রি- গহীনে মাছের মত চোখ
বাসা বাঁধে কেমন কেমন
খামখেয়ালি অসুখ।
ঘুমের অক্ষরে নেই ইন্দ্রজাল
হিজাব খোলা স্মৃতিগুলো মুখ তুলে !
সর্পগন্ধা ব্যথা বাঁশিতে সুর তুলে-
ভগ্ন রিদম নিয়ে উড়াল দিলো
সুখপাখি।

 

 

 

মোঃ আনোয়ার হোসেন ফারক এর  একগুচ্ছ একুশের  ছড়া
..
এক
ঘোলাপানির ঝোল
.
দিনটি ছিল ৮ই ফালগুন
রক্ত ঝরার দিন,
নামলো মাঠে দামাল ছেলে
শোধতে মায়ের ঋণ।
.
ঝড়ের বেগে উঠলো জেগে
দামাল ছেলের দল,
ঢাকার বুকে নামলো সেদিন
রক্তনদীর ঢল।
.
রক্তনদীর লহু হাওয়ায়
উঠলো দারুণ ঝড়,
ঝড়ের মুখে উপড়ে গেলো
উর্দুভাষার খড়।
.
কায়েম হলো ফের ধরাতে
বাংলামায়ের বোল,
পাকহানাদার খেয়ে গেলো
ঘোলাপানির ঝোল।
.
দুই।
ভাষার জয়
.
চেপে দিতে চাইলো ওরা
উর্দুভাষার ভূত,
রাগে ক্ষোভে নামলো মাঠে
বাংলামায়ের পুত।
.
ভূত তাড়াতে হাতে নিলো
সর্ষেদানার বীজ,
বুঝলো তখন পাকহানাদার
বাংলা কেমন চিজ।
.
জ্বললো আগুন ঢাকার মাঠে
পেলো ভূতে ভয়,
দামাল ছেলের রক্তদানে
আসলো ভাষার জয়।#
তিন।
বায়ান্ন
.
আগুন ঝড়ে উঠলো কেঁপে
সেই বায়ান্নের সাল,
পাকবুলেটে ঢাকার জমিন
হলো লালে লাল।
.
রক্তনদীর ঢেউ’র মাঝে
ছিলো দারুণ ঝাল,
ঝাল আগুনে পুড়লো শেষে
উর্দু নৌকার পাল।
.
ভেস্তে গেলো পাকবাহিনীর
নোংরা যতো চাল,
অবশেষে নিজের চালথই
হলো তাদের কাল।
.
উপচে পড়া রক্ত ঢেউ’য়ে
হারায় শেষে তাল,
ছিন্নভিন্ন হলো তাদের
ষড়যন্ত্রের জাল।
.
চার।
রাষ্ট্রভাষা
.
উর্দু হবে রাষ্ট্রভাষা
করলো নোটিশ জারি,
এমন খবর সাওর হলো
বাংলামায়ের বাড়ি।
.
বাংলামায়ের দামাল ছেলে
উঠলো ক্ষোভে ফেটে,
রাষ্ট্রভাষা বাংলা হবে
তৃষ্ণা যাতে মেটে।
.
প্রতিবাদের দাবানল ওই
জ্বললো ঢাকার বুকে,
উর্দুভাষা উড়ে গেলো
দাবানলের ফুঁকে।
.
বাংলা হলো রাষ্ট্রভাষা
রক্তনদীর বানে,
বাংলামায়ের দামালছেলে
দেশ বাঁচাতে জানে।#
পাঁচ।
শহীদ সালাম
.
ফেনীর ছেলে শহীদ সালাম
বায়ান্নের ওই বীর,
বেয়নটের সামনেও তাঁর
হয়নি নতো শীর।
.
আনতে বিজয় মায়ের ভাষার
যুদ্ধে দিলো ঝাঁপ,
সাহস দেখে হানাদারের
উঠলো বুকে কাঁপ।
.
ছুঁড়লো বুলেট পাকহানাদার
ঝাঁঝরা হলো বুক,
বুকের রক্তে তুললো মাতম
দাবানলের ফুঁক।
.
দাবানলের ফুঁকে জ্বললো
ষড়যন্ত্রের জাল,
জীবন দিয়ে ছিঁড়ে দিলো
উর্দুনৌকার পাল।#
.
ফেনী

 

 

মোল্লা-হুজুৱ
মাইদুল ইসলাম মুক্তা

আল্লাহ্-ঈশ্বৱ ডাকো ৱে ভাই,অন্তৱে ৱাখো ভয়,
মোল্লা-হুজুৱ মানেই কিন্তু জঙ্গী সন্ত্ৰাসী নয় ৷
ভালো মানুষ আছে বলেই,পৃথিবীটা আছে,
যাচাই-বাছাই কৱো আগে,মন্দ বলো পাছে ৷

টুপি-দাঁড়ি ৱাখলে যেমন মোল্লা-হুজুৱ হয় না,
মানব ধর্ম না বুঝিলে,মানুষ তাৱে কয় না ৷
টুপি-দাঁড়ি লেবাস বটে,দিলে থাকবে আল্লাহ্,
মানব ধর্মেৱ গান গাহিলে,ভাৱী হবে পাল্লা ৷

উহুদ বলো খন্দক বলো,সবি সামনা-সামনি,
আৱো যুদ্ধ কুৱুক্ষেত্ৰ সবি ছিল এমনি ৷
আত্মঘাতি জঙ্গী হামলা,ছিল বলো কবে ?
যুগেৱ জিহাদীৱা বলো,সুমতি কী হবে ?

সুমতি মন নিয়ে গাও তব ধর্মেৱ গান,
তবেই ধৱায় ফিৱবে শান্তি ফিৱবে ধর্মেৱ প্ৰাণ ৷
সকল ধর্মে মানব ধর্ম,মিলেছে এক হয়ে,
সাগৱ-নদী,ৱবি-শশি চলছে সম বয়ে ৷

সাগৱ-নদীৱ ধাৱা একই,তৃষ্ণা একই জলে,
ৱবি-শশিৱ আলো একই,এক আলোতেই চলে ৷
ভিন্ন নামে ভিন্ন গানে প্ৰভু কিন্তু একজন,
তোমাৱ আমাৱ মাঝেই প্ৰভু,গড়ো মানব বন্ধন ৷

 

 

 

অমরেশ
মোঃ ইব্রাহীম খলিল

রমনার রৌদ্রদগ্ধ বটের ছায়ায়,
যারা দিয়েছিল প্রাণ বাংলার মায়ায়।
আমাদের ভাই কিংবা আত্মীয়স্বজন,
“রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই” করেছিল পণ।
উর্দু, ফরাসি ভাষার হবে না প্রয়োগ,
ভিনদেশীদের হেথা হবে না নিয়োগ।
বাংলা হবে রাষ্ট্রভাষা পূর্বপাকিস্তান,
দিতে যদি হয় তবু দিবো নিজ প্রাণ।
প্রতিবাদ করেছিল রফিক, সালাম,
জীবন বলি দিয়েই দিতে হলো দাম।
বুলেটের আঘাত যে লেগেছিল বুকে,
বাংলা হল কণ্ঠবুলি কাঁদে মন দুখে।
চল্লিশ যুবা সেদিন দিয়েছিল প্রাণ,
সবুজের বুকে লাল বাংলার সম্মান।

বসন্তের মাতাল হাওয়া

সুমন মালাকার

ঋতুরাজ বসন্ত এলো
ফাগুনের হাত ধরে
তার আগমনে প্রকৃতি সেজেছে
নতুন সাজে সারা অঙ্গ ভরে,

নব পল্লবপুঞ্জে সুসজ্জিত বৃক্ষরাজীতে
কোকিলদের কুহু তানে গাওয়া
আমের মুকুলের মৌমৌ গন্ধে
মাতাল করা হাওয়া,

পলাশ শিমুলের রঙিন ফুল
রাঙিয়ে তুলেছে চারিদিক
মধুলোভী পাখি প্রজাপতি মৌমাছি
ছুটছে দিক্বিদিক,

চিরসবুজ বসন্ত ছুয়ে গেছে
নর নারীদের মাঝে
তাইতো সেজেছে তারা আজ
বাসন্তী রং এর সাজে,

তুমি আসবে বলে
বাতাসে বসন্তের গন্ধ
তুমি আসবে বলে
দুঃখ হারিয়েছে তার ছন্দ,

সখি অধিরে
বেলা বয়ে যায়
হারানো ফাগুন আজ
নতুনের গান গায়,

বসন্ত দিনের ফুলের ভালবাসা
ছড়িয়ে দিলাম…..
হৃদয়ের জানালা খুলে দিয়ে
অপেক্ষায় রইলাম,

বসন্তের মাতাল হাওয়ায় ভেসে
তুমি আসবে
রঙিন সাজে সেজে
বাসন্তী বাহারে হাসবে।।

 

প্রশ্ন
কাজী জহিরআহমেদ

আমারকিছুপ্রশ্নছিল
স্বাধীনতারকাছে,
আজও কেন দারিদ্রতায়
লক্ষ মানুষ বাঁচে?

এমন দেশে আজব বেশে
লুট হয়ে যায় টাকা
রাত্রি শেষে ঘুমের রেসে
সবই লাগে ফাঁকা।

রাজনৈতিকের কথাশুনে
শূন্যে ভাসে বুক
উন্নয়নের জোয়ার এলো
মিথ্যে কথায় সুখ।

বিশ্বালয়ের বন্দি ফ্রেমে
দাঙ্গা বাজি চলে
নেতার মুখের তেতো কথায়
সারাগা জ্বলে।

২৬শে মার্চ এলেই দেখি
মুখচোরাদের দল
প্রদীপ হাতে আগুন জ্বালে
ঝরিয়ে চোখের জল।

আজো কেন এই দেশেতে
রক্তের চলাচল,
কিসের দোষে ধর্ষিত হয়
তণুর মায়ের জল।

স্বাধীনতা তোমারকাছে
করছি মিনতি
হেমন্তের ঐ হিম শিতলে
জ্বলুক জোনাকি।

 

 

 

হৃদযয়ে আটই ফাল্গুন
সাহানুকা হাসান শিখা

কেমনে ভুলিবো মোরা আটই ফাল্গুনের কথা,
লক্ষ লক্ষ মায়ের কান্না,বুকের পাঁজরে ব্যথা।
রক্তের নদীতে নৌকা বোঝাই মোদের বাংলা ভাষা,
সালাম,রফিক ,বরকতের মনে ছিলো কতা আশা।
লক্ষ শহিদরা রক্ত দিয়েছে,শ্লোগান দিয়েছে লড়বো,
বায়ান্নতে ভাষাআন্দোলন পেয়েছিলো তাই গর্ব।
বাংলা ভাষায় কবিতা লিখি,বাংলায় গাই গান,
শহীদ মিনারে ঘুমিয়ে আছে,শত শত মহীয়াণ।
ধীরে ধীরে মোরা এগিয়ে যাই রাত্রি দ্বীপ্রহর,
সালাম জানাই শহীদের তরে, শ্রদ্ধা নিরন্তর।
প্রতি বছরে বারে বারে আসে আটই ফাল্গুন,
শহীদ জননীর বুকের আগুন জ্বলে উঠে দ্বীগুন।

 

 

একুশ
-তাছলিমা শাহনুর
মধ্যরাত সারা আকাশ জুড়ে
আলোর বিস্ময় ছায়া পথ
উচ্ছ্বাস চাঁদের সাথে খেলে,
এতসব আয়োজনে আমি দেখি
আমার বর্ণমালার ভোর।
বাহান্নর পাতা জুড়ে অবিচল ইতিহাস
উজ্জ্বল, অমলিন, উম্মেস মানুষের অহংকার।
আ-মরি বাংলা ভাষা।
সালাম,রফিক, জব্বার
আরো কতো নাম না জানা
শহীদের রক্তে সেদিন-
রাজপথ রক্তগঙ্গায় ভেসেছিল,
বুলেটের শব্দে কেঁপেছিল গোটা দেশ—
বিনিময়ে লাখো বাঙালি
বিজয়ের গৌরব গাঁথা
প্রভাতফেরি, একুশের মহান ভাষা, মা, মাটি
স্বীকৃতি পেল বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে।
আমি চাইনা স্বর্গরাজ্যের ত্রিয়োদশ,
স্বর্গে মর্তসীমা থেকে—ও
অনিন্দ্য ভালোলাগা আমার দেশ,
আমার মাটি, আমার একুশ,
আমাদের অর্জিত অহংকার।

 

 

 

বাংলা ভাষার কীর্তি
ফাতেমা জাহান লুবনা

মধুর চেয়েও মিষ্টি যেন বাংলাভাষার বুলি,
এ ভাষাতেই আপন মনে স্বপ্ন দেখে চলি।
বাংলা ভাষায় বললে কথা জুড়ায় মন ও প্রাণ,
এ ভাষার সাথে মিশে আছে আম-কাঁঠালের ঘ্রাণ।
বাংলা নাকি হিন্দুয়ানী বলছে কিছু লোকে তাই,
আমার কাছে প্রাণের ভাষা; প্রাণের মাঝে সাড়া পাই।

ফুটলে ফুল ডালে ডালে গাছের যেমন শোভা হয়,
বাংলা ভাষা রতেœ ভরা; হাজার বছরের পরিচয়।
এমন ভাষায় বলতে কথা গর্বে ভরে যায় যে বুক,
আমার ভাষায় প্রকাশ করি দুঃখ কিংবা সুখ।
স্বাধীন চেতা-স্বাধীন আমি বংলায় বলি কথা,
আমার ভাষায় বলতে কথা মানব না তো বাধা।

কিনতে ভাষা রক্ত ঢেলেছে রফিক-সালাম-জব্বার,
তাই তো বাংলায় বলতে কথা প্রেরণা পাই দুর্বার।
অমর হয়ে আছে বাংলায় ভাষা শহীদদের স্মৃতি,
পাকিস্তানের উর্দু বাদে বাংলা ভাষার কীর্তি।
ভুলিনি কভু- ভুলব না মোরা ভাষা শহীদদের দান,
স্রষ্টার কাছে দু’হাত পেতে দোয়া করি যিনি মহান।

রক্ত দিয়ে কিনল যাঁরা আমার মুখের ভাষা,
জান্নাতে থাকুক তাঁরা এই করি আমি আশা।
দোয়া করি পাক তাঁরা সুবাসিত ফুলের সুগন্ধি,
স্রষ্টার তরফ হতে আত্মায় অনন্তকালীন শান্তি।
দিকে দিকে যাক ছড়িয়ে বাংলা ভাষার কীর্তি,
হাজার ভাষার মাঝে স্রষ্টার এ মধুরতম সৃষ্টি ।

 

 

রক্তের দাম
এস এইচ রুবেল

বাংলা আমার মায়ের ভাষা
বাংলা আমার গান
বাংলা ভাষার জন্য যারা
দিয়েছিল প্রাণ,
যায়নি তারা আজও হারিয়ে
আছে সারা হৃদয় জুড়ে
বাংলার আকাশে বাতাসে
ধ্বনিত হয় তাদের নাম,
মাতৃভাষা বাংলা আমার
তাদের রক্তের দাম।
ছিনিয়ে এনেছে মায়ের ভাষা তারা
দিয়ে আপন প্রাণ,
ভুলি নাই, ভুলবনা তাদেরকে মোরা
হয়ে থাকবে তারা অম্লান।
সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার
নাম না জানা আরো
মিছিলে গিয়ে ফিরে আসেনি
মায়ের কোলে কারো।
রাজপথে নেমে বুক ফুলিয়ে
বলেছিল রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই,
মায়ের ভাষা রক্ষার্থে
রক্ত দিতে হল তাই।

 

একুশ এলে
কবির কাঞ্চন

বছর ঘুরে একুশ এলে
সাহস জাগে মনে
অপার সুখে হয় মিতালি
বাংলা ভাষার সনে।

ভাই হারানোর গান গেয়ে যাই
ফেব্রুয়ারির দিনে
ছেলেহারা মা’র চোখের জলে
বাংলা ভাষা চিনে।

সালাম জব্বার রফিক আরো-
কতো অজানা ভাই
বুকের তাজা রক্ত ঢেলে
শহীদের সম্মান পায়।

একুশ দিলো প্রেরণা মনে
একুশ দিলো আশা
আমার ভাইরা জীবন দিয়ে
নিলো ভালোবাসা।

যতোদিন রবে এই বাংলা
বিশ্বজগৎ মাঝে
পরম শ্রদ্ধায় স্মরিব তাঁদের
সকালবিকাল সাঁঝে।

বসন্তের মাতাল হাওয়া

ঋতুরাজ বসন্ত এলো
ফাগুনের হাত ধরে
তার আগমনে প্রকৃতি সেজেছে
নতুন সাজে সারা অঙ্গ ভরে,

নব পল্লবপুঞ্জে সুসজ্জিত বৃক্ষরাজীতে
কোকিলদের কুহু তানে গাওয়া
আমের মুকুলের মৌমৌ গন্ধে
মাতাল করা হাওয়া,

পলাশ শিমুলের রঙিন ফুল
রাঙিয়ে তুলেছে চারিদিক
মধুলোভী পাখি প্রজাপতি মৌমাছি
ছুটছে দিক্বিদিক,

চিরসবুজ বসন্ত ছুয়ে গেছে
নর নারীদের মাঝে
তাইতো সেজেছে তারা আজ
বাসন্তী রং এর সাজে,

তুমি আসবে বলে
বাতাসে বসন্তের গন্ধ
তুমি আসবে বলে
দুঃখ হারিয়েছে তার ছন্দ,

সখি অধিরে
বেলা বয়ে যায়
হারানো ফাগুন আজ
নতুনের গান গায়,

বসন্ত দিনের ফুলের ভালবাসা
ছড়িয়ে দিলাম…..
হৃদয়ের জানালা খুলে দিয়ে
অপেক্ষায় রইলাম,

বসন্তের মাতাল হাওয়ায় ভেসে
তুমি আসবে
রঙিন সাজে সেজে
বাসন্তী বাহারে হাসবে।।

লেখক- সুমন মালাকার
সাংবাদিক- ঝিনাইদহ।।

 

 

 

টুঙ্গিপাড়ার খোকা
মোহাম্মদ মাসুদ কামাল

বক্ষদেশ উমুক্ত করে চলতে শেখালো
মাথা উঁচু করে বাচতে শেখালো
মরণকে আলিঙ্গন করতে সাহস জোগালো,
সে আর কেউ নয় বাংলার বুকে
টুঙ্গিপাড়ার সোনার ছেলে
সেথায় আজও শুয়ে,
সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখে
বাংলার গোলাপ, জবা
কাশফুলের সুঘ্রাণ হয়ে!!

প্রতিবাদী হতে শেখালো
আন্দোলন করে দেখালো
বিজয়ী হয়ে দেখালো,
সে আর কেউ নয় বাংলার জমিনে!!
বাঙালীর মুজিব ভাই
আছেন টুঙ্গিপাড়ায় শুয়ে,
দোয়া করে বাংগালী
মুনাজাতে গিয়ে!!!

মুক্তির ডাক দিয়ে দেখালো
মুক্তিযোদ্ধে প্রেরণা যোগালো
ও, কার, সে আহব্বানে!!?
সে আর কেউ নয় বাংলার ইতিহাসে!!
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান..
টুঙ্গিপাড়ায় শুয়ে হাসে!!!।।

ত্রিশ লক্ষ প্রান শহীদ হলো
দুই লক্ষ মা” বোন ইজ্জৎ হারালো
ও, কার, সে মান রাখতে!?
সে আর কেউ নয় বাংলার আকাশে!!
জাতির পিতা শেখ মুজিব রহমান..
শব্দহীন , টুঙ্গিপাড়ার বাতাসে!!!

স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা
চলার পথে মানতে হবে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা,
হবেনা এইসব শুধুই কথার কথা,
কে বলেছে!?
জনতা শুনেছে!!
সে আর কেউ নয় বাংলার মানচিত্রে.!
জনতার প্রিয়…
টুঙ্গিপাড়ার খোকা!
আজও বলছে জান্নাত থেকে
অধুরা স্বপ্ন চিত্তে!!।।

 

 

একুশ এলে
জয়নব জোনাকি

একুশ এলে দেশপ্রেমীদের
মাতৃভাষার টঙ বসে,
নিত্য দিনই ওদের ঘরে
পরের ভাষার রঙ বসে,
কথার মাঝে ঢঙ বসে,
রক্তে কেনা মায়ের বোলে
অবহেলায় জঙ বসে।

মায়ের বুকের বর্ণমালা
নিচ্ছে যারা গ্রাস করে,
নিজের ভাষা ভুলে এখন
ভিন্ন ভাষায় ত্রাস করে,
মারবো ফায়ার ব্রাশ করে,
তাদের সাথে হয়কি আপোষ
দেবোই ওদের ক্রাশ করে।

রুপান্তর আজ মায়ের ভাষা
মধু থেকে কর্কশে,
অন্যভাষার আমদানিতে
দালাল শ্রেণী দর কষে,
বাংলা ভাষা রাখতে সচল
ভণ্ডদের আজ ধরকষে।

x

Check Also

এসএসসিতে পাসের হার ৭৭.৭৭%

Share চলতি বছরের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। এতে ১০ শিক্ষা বোর্ডে গড়ে পাসের হার ৭৭ দশমিক ৭৭ শতাংশ। আর জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৬২৯ জন। রবিবার ...

লোটাস কামালের দুর্গে বিএনপির দুই ভূঁইয়ার দ্বন্দ্ব!

Share নাঙ্গলকোট উপজেলার একটি পৌরসভা ও ১৬টি ইউনিয়ন, নবগঠিত লালমাই উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন ও কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন নিয়ে কুমিল্লা-১০ আসন। আয়তন ও জনসংখ্যার দিক থেকে দেশের অন্যতম বড় আসন এটি। আসনের প্রতিটি ...