আজ : মঙ্গলবার, ৮ই শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২৩শে জুলাই, ২০১৯ ইং, ১৯শে জিলক্বদ, ১৪৪০ হিজরী, সকাল ৭:২৪,

জয়নাল আবেদীন ভূঁইয়া; রাজনীতিতে সততা এবং একজন

নঈম নিজাম 

তাঁর এভাবে চলে যাওয়ার কথা ছিল না। তবুও চলে গেলেন নাঙ্গলকোটের জয়নাল ভাই। সাদামাটা মানুষ, মাটি ও মানুষের নেতা। রাজনীতি শুরু করেছিলেন কুমিল্লা থেকে। ষাটের দশকে ভিক্টোরিয়া কলেজে ছাত্রলীগের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ’৭১ এ যোগ দেন স্বাধীনতা যুদ্ধে। স্বাধীনতার পর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে জয়ী হন। চোখে পড়েন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট সহচর কুমিল্লার কাজী জহিরুল কাইয়ুম বাচ্চু মিয়ার। ’৭৯ সালে কাইয়ুমের সিদ্ধান্ত মতে অংশ নেন সংসদ নির্বাচনে। প্রতিপ শিামন্ত্রী কাজী জাফর আহমেদ। ব্যক্তিগত জীবনে কাজী জাফর আহমেদ ছিলেন বাচ্চু মিয়ার ভাতিজা। চৌদ্দগ্রামের কাজী পরিবার বিভক্ত। এক বাড়ি থেকে দু’জন নির্বাচন করলে সমস্যা। তাই জয়নাল আবেদীন ভূঁইয়াকে নির্বাচনে আনেন বাচ্চু মিয়া। কিন্তু সবকিছু জয়নাল ভাইয়ের জন্য চ্যালেঞ্জ। বাচ্চু মিয়াকে সঙ্গে নিয়ে শুরু করেন প্রচারণা। সময়টা আওয়ামীলীগের বিপক্ষে। কিন্তু পরিস্থিতি জয়নাল ভাইকে সহায়তা করে। নির্বাচনে জয়ী হন তিনি। আওয়ামীলীগের ৩৯ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে তিনিও একজন। এমপি হলেও পরিবর্তন আসেনি তার মাঝে। বরং মানুষের সাথে যোগাযোগ আরো বেড়ে যায়। এমপি হোস্টেলের দরজা ছিল সবার জন্য খোলা। রাত নেই, দিন নেই। যারা আসছেন তাদের জন্য কাজ করছেন। কাজ করেই তার আনন্দ। এর মধ্যে শুরু করেন নতুন আন্দোলন। চৌদ্দগ্রাম এবং লাকসামের অবহেলিত ১১টি ইউনিয়ন নিয়ে গড়ে তুলেন নতুন থানা। নাম নাঙ্গলকোট। সামরিক শাসনে সরকার পরিবর্তন হয়। সংসদ সদস্য পদ হারালেও তার কাজ থেমে থাকেনি। বরং নতুন থানার লোকদের নিয়ে তার কাজের পরিধি আরো বেড়ে যায়। ’৮৬ সালের নির্বাচনে জয়ী হতে পারেননি কারচুপির কারণে। ’৯১ সালে জয়ী হতে পারেননি ডাঃ একেএম কামরুজ্জামানের মত জনপ্রিয় প্রার্থীর কারণে। কিন্তু ’৯৬ সালে আবারো জয়ী হন। ২০০১ সালে পরাজয়। রাজনীতির সংপ্তি এ পরিচিতি জয়নাল ভাইকে বোঝা যাবে না। মাটি ও মানুষের নেতা বলতে যা বুঝাই তাই ছিলেন তিনি। ২৪ ঘন্টা মিশে থাকতেন মানুষের সঙ্গে। অন্য কোন পেশা ছিল না। কোন ব্যাংক একাউন্ট নেই। ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত হলেও সংসারের দায়িত্ব ছিল কম। ঢাকার ফ্যাটটি শ্বশুরের। চাল, ডাল, বাজার আসতো শ্বশুর বাড়ি থেকে। ভাবী সাদামাটা মানুষ। একটি মাত্র মেয়ে। নিজের পরিবারকে সময় দিতে পারছেন না। এ কারণে তার মন খারাপ হতে দেখিনি। বরং নাঙ্গলকোটের মানুষজনকে না দেখলে তার মন খারাপ হতো। একলা চলতে পারতেন না। একলা খেতে পারতেন না। নিচে ১০ জন উপরে শতাধিক মানুষকে নিয়ে হতো তার দুপুরের খাবার। বাসায় বাজার আছে কিনা জানার চেষ্টা করতেন না। রান্না হয়েছে কিনা খবর নিতেন না। কিন্তু দুপুরে অনেক মানুষ নিয়ে খেতে আসতেন। নাঙ্গলকোটের মানুষ এ বাসাটিকে তাদের ঠিকানা মনে করত। রাত নেই, দিন নেই গিয়ে হাজির হতো। তাকে কোনদিন বিরক্ত হতে দেখিনি। গভীর রাতেও কোন মানুষ তার বাসার দরজায় নক করলে তিনি হাসিমুখে বেরিয়ে আসতেন। আগমনকারী ব্যক্তিকে হয়তো চিনতেন না। কিন্তু স্বজনের মতো খোঁজ-খবর নিতেন। নাঙ্গলকোটের কোন মানুষের বিপদের কথা শুনলে ছুটে যেতেন। হাসপাতাল, বিমানবন্দর, রেলষ্টেশন, জেল, পুলিশ, থানা সবখানে ছিল তার বিচরণ। যার যেখানে সমস্যা সেখানে যেতেন। যাদের নিয়ে যেতেন তাদের কাছে টাকা নেই। সমস্যা নেই, জিম্মি থাকতেন জয়নাল ভাই। অনেক সময় আইনজীবির টাকা দিতে পারতেন না। কিন্তু এ কারণে মন খারাপ করতেন না। সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরুর কাছে প্রায়ই ছুটে যেতেন। তদবির একটাই- এলাকার গরীব আওয়ামীলীগ কর্মী। বিনা পয়সায় মামলাটি চালাতে হবে। খসরু ভাই একদিন হাসতে হাসতে বললেন- সব বিনা টাকায় হলে চলবে কি করে? জয়নাল ভাই থেমে নেই। তিনি বললেন- আমি নঈমকে বলে দিচ্ছি তোমাকে টেলিভিশনের একটি অনুষ্ঠানে নিয়ে যাবে। খসরু ভাই হাসলেন। বললেন- ঠিক আছে নঈমকে বলার দরকার নেই। আমি মামলা চালাবো। মানুষের জন্য এভাবে কাজ করতেন। কে কোন দল করছে, কোন মতে বিশ্বাসী এসব তার কাছে বিবেচ্য ছিল না। মানুষের টান আর মাটির টান ছিল তার কাছে বড়। জয়নাল ভাইয়ের জীবন যাপনও ছিল সাদামাটা। দামী পোশাক পরতেন না। একবার শীতে আমার এক বন্ধু জয়নাল ভাইয়ের জন্য ব্লেজার পাঠায়।

নাঙ্গলকোটে ঘুরে ঘুরে মানুষদেরকে বলতেন- এ ব্লেজার লন্ডন থেকে নঈম এনে দিয়েছে। এত সাদামাটা মানুষ। জয়নাল ভাইয়ের কোন ব্যাংক একাউন্ট ছিল না। টাকা হাতে আসলে খরচ করে ফেলতেন। আওয়ামীলীগ মতায় থাকাকালীন একবার দেখা করলেন প্রধানমন্ত্রীর সাথে। বিষয় গুলশানে একটি প্লট দিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তাঁর সাদামাটা জীবনের কথা জানতেন। এজন্য প্রধানমন্ত্রী বললেন- গুলশানে প্লট নিয়ে কি করবেন? জয়নাল ভাই জবাব দিলেন, পাওয়া মাত্রই বিক্রি করে দেব। সে টাকার কিছুটা ব্যয় করবো নির্বাচনে বাকিটা দিয়ে একখন্ড জমি কিনবো। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের ডেকে বললেন- এই হচ্ছে আমার আওয়ামীলীগ, আমার গর্ব। ২০০১ সালের নির্বাচনে পরাজয়ে ভেঙ্গে পড়েননি। মাঝে মাঝে আমার অফিসে আসতেন। বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতেন। আমাকে দিয়ে ফোন করাতেন ছাত্রলীগের লিয়াকত সিকদারকে, যুবলীগ চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাধারণ সম্পাদক মির্জা আজমকে। আওয়ামীলীগের আরেকটি সমস্যা নিয়ে আসলেন আরেক দিন। সঙ্গে ব্যবসায়ী মমিন ভাই। আমাকে জোর করে নিয়ে গেলেন আওয়ামীলীগ সাধারণ সম্পাদক জলিলের কাছে। আমাকে বলতেন- তুমি তো আজকাল নাঙ্গলকোটে যাওনা। গিয়ে দেখ, মানুষ আমার জন্য কিভাবে পাগল হয়েছে? মানুষের টান আমার জন্য অনেক বেড়েছে। আমি বলতাম আপনার কাছ থেকে আওয়ামীলীগের থানা নেতারা সরে যাচ্ছেন। তিনি হাসতেন। বলতেন তাদের কারণে পরাজিত হয়েছি। তারা দূরে সরলে আমার ভোট বাড়বে। কর্মব্যস্ততার কারনে নাঙ্গলকোটে যাওয়া হয়নি। জয়নাল ভাইয়ের জনপ্রিয়তা দেখার ভাগ্য হয়নি। কিন্তু যখন হয়েছে তখন তিনি নেই। নাঙ্গলকোটের মানুষদেরকে কান্নার সাগরে ভাসিয়ে তিনি চলে গেলেন। ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি সন্ধ্যায় অফিসে বসে আছি। অত্যন্ত ব্যস্ত সময়। এর মধ্যে আমার ভাগ্নে সলিম উল্লা মিয়াজি খবর দেয় কুমিল্লাতে জয়নাল ভাইয়ের আবার হার্ট এ্যাটাক হয়েছে। আমি তাকে বললাম তাড়াতাড়ি সিকদারে নিয়ে আসতে বলো। প্রথমে বিষয়টি গুরুত্ব দেইনি। কারণ এর আগের বছর কোরবানির ঈদে বাড়ীতে গিয়ে এমনটি হয়েছিল। ডাক্তারের পরামর্শ ছিল ওপেন হার্ট সার্জারি করানোর। কিন্তু কে শুনে কার কথা। তিনি অপারেশন করাননি। কিন্তু এবার এমন ঘটনা ঘটবে তা ভাবতেও পারিনি। কুমিল্লা থেকে ফোন জয়নাল ভাই আর নেই। এক কাপড়ে বেরিয়ে এলাম অফিস থেকে। সোজা কুমিল্লা। জেলা আওয়ামীলীগের অফিসে তার লাশ সাদা কাপড়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছে রাজনৈতিক সহকর্মীরা। আবদুল কাদির বিএসসি’র মতো প্রবীণ লোকের কান্না কোনভাবেই কেউ থামাতে পারছে না। সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল করিম মজুমদার, এ্যাডভোকেট লিটন, তাহের চেয়ারম্যান, ভাতিজা বাছিরসহ শত শত নেতা-কর্মী কাঁদছে। যে আওয়ামীলীগ নেতারা তাকে এক সময় যন্ত্রণা দিয়েছিলেন তাদেরকেও দেখলাম হা-হুতোশ করতে। ভিতরে চিৎকার করে কাঁদছে তার কন্যা স্নিগ্ধা। বাবার স্নেহ এ মেয়ে আর কোনদিন পাবে না। এ মেয়েকে সান্ত¡না দেবে কে? জেলা আওয়ামীলীগ নেতা আফজল খান, হুইপ মুজিবুল হক, অধ্যাপক খোরশেদ আলম, এ্যাডভোকেট আহাম্মদ আলী, আবদুর রউফ সবাই আছে। কুমিল্লার সাংবাদিকদেরও ভীড় রয়েছে। সবাই শোকাহত। কিন্তু আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে জয়নাল ভাই নেই। মনে হচ্ছিল এখনই তিনি উঠে দাঁড়াবেন। কিন্তু তিনি উঠে দাঁড়ালেন না। এর মধ্যে হবিগঞ্জে মর্মান্তিক ঘটনার খবর। অফিসে বারবার কথা বলতে হচ্ছে। শোক-দুঃখ সাংবাদিকদের থাকতে নেই। সাংবাদিকরা তো মানুষ নয়। সাংবাদিক। ২৮ জানুয়ারী প্রথম জানাযা কুমিল্লা টাউন হল মাঠে। সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু, সাবেক ডেপুটি স্পিকার অধ্যাপক আলী আশ্রাফ, সংসদ সদস্য তাজুল ইসলাম, জেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম, আওয়ামীলীগ নেতা আফজাল খাঁন, মুজিবুল হক, অধ্যাপক খোরশেদ আলম সবাই শ্রদ্ধা জানিয়ে বক্তব্য রাখলেন। আমাকে বক্তব্য রাখতে বলা হলো। কিন্তু আমি কোন কথাই বলতে পারিনি। আমার রক্তরণ এভাবে বলা সম্ভব ছিল না। বিশাল জানাজা শেষে লাশ প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয় নাঙ্গলকোটে। সেখানে আরেকটি বিশাল জানাজা। সাবেক সাংসদ ডাঃ এ কে এম কামরুজ্জামান স্মৃতিচারণ করেন। বক্তব্য রাখেন তৎকালীন সাংসদ আবদুল গফুর ভূঁইয়া, সালাহ উদ্দিন আহমেদ, সাইফুল গণি চৌধুরী, বিগ্রেডিয়ার জালাল আহমেদ, রুহুল আমিন মোল্লা, রফিকুল হোসেন, শামছুদ্দিন কালু, প্রফেসর সাদেক হোসেন, অধ্য আবু ইউছুফ, শাহজাহান মজুমদার, এ্যাডভোকেট আবদুল গফুর মজুমদার প্রমুখ। শেষ জানাজা ঢালুয়ার বদরপুর গ্রামে। লাখ মানুষের ঢল সেখানেও। দলমত নির্বিশেষে সকলে এসেছে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে। হাজার হাজার মানুষ চিৎকার করে কাঁদছে। স্বজন হারানোর বেদনায় সবাই সিক্ত। নাঙ্গলকোটের মানুষ এর চেয়ে আপন আর কাকে পাবে? এমন ভালবাসা তাদের কে দেবে? কার বাড়িতে গিয়ে তারা রাত ২টার সময় নক করবে? কে হাত বাড়িয়ে বুকে টেনে নিবে? মানুষের দুঃখের খবরে কে গ্রামের পর গ্রাম ছুটে বেড়াবে?

লেখক: সম্পাদক- বাংলাদেশ প্রতিদিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

নাঙ্গলকোট রাইটার্স এসোসিয়েশনের পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত

Share স্টাফ রিপোর্টার: কুমিল্লার নাঙ্গলকোট রাইটার্স এসোসিয়েশনের রেজি:, বিজয় দিবস উদযাপন, বাৎসরিক প্রোগ্রাম ও আগামি ২০ নভেম্বর এসোসিয়েশনের ১০ বর্ষে পদার্পন উপলক্ষে পরামর্শ সভা ২ নভেম্বর শুক্রবার বিকাল ৪টায় পৌরসভার রওশন রফিক একাডেমী মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। ...

দ‌ক্ষিণবঙ্গের ঐতিহ্য চুইঝাল!

Share মৃত্যুঞ্জয় রায়, খুলনা: খুলনা বিভাগে চুইঝাল এত জনপ্রিয় যে একে খুলনার কৃষিপণ্য হিসেবে ব্র্যান্ডিং করাই যায়। খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর বাজারে আব্বাসের হোটেল চুইঝাল দিয়ে রান্না করা খাসির মাংসের জন্য বিখ্যাত হয়ে উঠেছে। চুইঝাল-মাংস খুলনার ...