আজ : সোমবার, ৮ই শ্রাবণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ২৩শে জুলাই, ২০১৮ ইং, ৯ই জিলক্বদ, ১৪৩৯ হিজরী, সকাল ৯:৫২,

কিশোর অপরাধে ‘মোটরবাইক’!

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি | সোনালী দেশ: 
 চট্টগ্রাম মহানগরীর কাজেম আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র আরমান। প্রতিদিন সে স্কুলে যাওয়া আসা করে মোটরবাইকে। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় স্কুলে যাওয়া-আসার জন্য শখ করে তাকে মোটরসাইকেল কিনে দেন মা-বাবা। কিন্তু এই মোটরসাইকেল পেয়েই বখে যায় আরমান। মোটরসাইকেলে স্কুলে যাওয়া-আসার পরিবর্তে সে যোগ দেয় গ্যাং গ্রুপের নানা অপরাধ কর্মকাণ্ডে। মাদক বেচাকেনা, ছিনতাই, গান-বাজনা, খেলার মাঠ, ড্যান্স ও ডিজে পার্টি, ক্লাবের আড্ডায় মেতে উঠে সে।
স্কুল ছাত্রলীগ নেতা হিসেবে কাজেম আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজে তার নিজের নামে রয়েছে একটি গ্যাং গ্রুপ।যার সদস্য সংখ্যা ত্রিশের উপরে। নগরীর চান্দগাঁও থানার ফরিদের পাড়ায় নিজ বাড়ি এলাকায়ও স্কুল ছাত্রলীগের নামে তার রয়েছে আরও একটি গ্যাং গ্রুপ। যার অন্যতম হচ্ছে হাজেরা তজু উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র মঈন হোসেন। এই মঈন হোসেনের ছুরিকাঘাতে গত ১৬ই জানুয়ারি খুন হয়েছে কলেজিয়েট স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র আদনান ইসফার (১৫)। সেদিন মোটরবাইকে আরও দু’জনকে সঙ্গে নিয়ে মঈন হোসেন দ্রুতবেগে জামাল খান আইডিয়াল স্কুলের সামনে পৌঁছে। সঙ্গে ছিল আরমানও। আরমানের মোটরবাইকেও ছিলো আরও দুইজন। আরমান পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হলেও মঈন হোসেন এখনো পলাতক রয়েছে। পুলিশ তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে। কিন্তু হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মোটারবাইক দু’টি জব্দের বিষয়ে তেমন কোনো মাথাব্যথা দেখা যায়নি পুলিশের।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) এসএম মোস্তাইন হোসাইন বলেন, হত্যাকান্ডে মোটরবাইক ব্যবহারের বিষয়টি পুলিশের নজরের বাইরে রয়েছে। তবে বিষয়টি নজরে আনা হচ্ছে।
প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরে অনেক কিশোর মোটরবাইক চালাতে দেখা যায়। কিন্তু এরা যে অপরাধ কাজে এসব মোটরবাইক ব্যবহার করছে তা পুলিশের নজরে আসেনি। এ ব্যাপারে পুলিশ প্রশাসন আরও সতর্ক হবে।
চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ সূত্র জানায়, নগরীর ১৬ থানা এলাকায় প্রায় অর্ধশত কিশোর গ্যাং রয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি হাজী মুহম্মদ মুহসীন উচ্চ বিদ্যালয়, কলেজিয়েট স্কুল, কাজেম আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বাকলিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, হাজেরা তজু উচ্চ বিদ্যালয়, নাসিরাবাদ সরকারি হাইস্কুলসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন স্কুল ভিত্তিক এসব কিশোর গ্যাং ছাত্রলীগের নামে সক্রিয়।  যারা নগরীর স্টেশন রোড, বিআরটিসি মোড়, কদমতলী, চকবাজার, মেডিকেল হোস্টেল, শিল্পকলা একাডেমি, সিআরবি, খুলশী, ফয়’স লেক, ডেবারপার, চান্দগাঁও শমসের পাড়া, ফরিদের পাড়া, আগ্রাবাদ সিজিএস কলোনি, সিডিএ, ছোটপুল, হালিশহর, বন্দর কলোনি ও পতেঙ্গার বেশ কয়েকটি এলাকায় মাদক বেচাকেনাসহ মোটরসাইকেল ও সাইকেল ছিনতাই, গান-বাজনা, খেলার মাঠ, ড্যান্স ও ডিজে পার্টি, ক্লাবের আড্ডাসহ বেশ কিছু বিষয় নিয়ন্ত্রণে মরিয়া।
শুধু তাই নয়, এসব কিশোর গ্যাং চক্র মেয়েদের ভ্যানিটি ব্যাগ ও মোবাইল ছিনতাইয়ের অধিকাংশ ঘটনায় জড়িত। নিজ এলাকা ছাড়িয়ে অনেক সময় তারা নগরীর বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে নানা অপরাধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে থাকে। এসব কর্মকাণ্ডে মোটরবাইক ব্যবহার হয় বেশি। যা পুলিশের নজরে থাকলেও কিশোর হওয়ার কারণে বিষয়টি তেমনভাবে ভাবা হয়নি। নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার মো. কামরুজ্জাামান এ প্রসঙ্গে বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের অধিকাংশ কিশোরের নিজস্ব মোটরবাইক রয়েছে। ফলে মোটরবাইকে করে যে কোনো অপরাধ কর্মকাণ্ডে ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায় তারা। অপরাধ কর্মকাণ্ডে এই মোটরবাইক তাদের গতি বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, মোটরবাইক হাতে পাওয়া কিশোররা একেবারেই বেপরোয়া। যারা রাস্তায় দাপিয়ে চলে।  মোটরবাইকে স্কুলে গিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর প্রভাব বিস্তার করে। এদের অনেকে স্কুলের শিক্ষক ও অভিভাবকদের মানে না। হেরফের হলে অপদস্তও করে। আর এদের গুরু হচ্ছে স্থানীয় কতিপয় ছাত্রলীগ-যুবলীগ ও আওয়ামী লীগ নেতা। তিনি আরও বলেন, আদনান ইসফারকে হত্যায় সাব্বিরকে পিস্তল সরবরাহ দেন নগরীর চকবাজার ওয়ার্ডের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক আবদুর রউফ। আরমানকে অস্ত্র দেয় ছাত্রলীগ নেতা এনাম। তারা আদনানের মাথা ও পিঠে অস্ত্র ঠেকালেও ব্যবহার করেনি। শেষ পর্যন্ত মঈন হোসেনের ছুরিকাঘাতে খুন হয় আদনান। আর হত্যাকাণ্ডের পর খুনি কিশোর আরমান, সাব্বির, মুনতাসির, মহিম ও আবু সাঈদ আশ্রয় নেয় আবদুর রউফের চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির বাড়িতে। যাদেরকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। অপরপক্ষে আদনান ইসফারও জামালখান এলাকার ছাত্রলীগের আরেক নেতা সাব্বিরের অনুসারী স্কুল ছাত্রলীগ নেতা ছিল। তার গ্রুপের অনেকের ছিল মোটরবাইক। ফলে সামান্য কথা কাটাকাটিতেও একজন অন্যজনকে চিৎকার করে মোবাইলে ফোন দেয়। মুহূর্তের মধ্যে সদলবলে হাজির হয়। এরপর চলে প্রতিপক্ষের ওপর হামলা, গাড়ি ভাঙচুর এমনকি দোকানপাট ভাঙচুর। কোনও এক জায়গায় বসা নিয়ে কথিত বড়ভাইদের সঙ্গে ছোটভাইদের কথাকাটাকাটি থেকেও লিপ্ত হয় সংঘাত-সংঘর্ষে। চট্টগ্রাম মহানগরীর অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম ও অপারেশন) সালেহ মোহাম্মদ তানভীর বলেন, রাজনৈতিক ছত্রছায়া, অর্থ ও প্রভাব প্রতিপত্তির কারণে এসব কিশোর গ্যাংয়ের উত্থান। এদের শক্তির মূল বাহন হচ্ছে মোটরবাইক। যা শখের বশে কিনে দিয়েছেন মা-বাবা। আবার অনেক কিশোর অপরাধ কর্মকাণ্ড করে টাকা পেয়ে মোটরবাইক কিনেছে। তিনি বলেন, কিশোর অপরাধ বন্ধ করতে পারিবারিক ও সামাজিক অনুশাসন দরকার। পারিবারিক অনুশাসন বাড়াতে হবে। সামাজিক অনুশাসন পুনরুদ্ধার করতে হবে। রাজনৈতিক ইন্ধন বন্ধ অথবা প্রত্যাহার করতে হবে। ইন্ধনদাতা বড় ভাইদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

এসএসসিতে পাসের হার ৭৭.৭৭%

Share চলতি বছরের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। এতে ১০ শিক্ষা বোর্ডে গড়ে পাসের হার ৭৭ দশমিক ৭৭ শতাংশ। আর জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৬২৯ জন। রবিবার ...

লোটাস কামালের দুর্গে বিএনপির দুই ভূঁইয়ার দ্বন্দ্ব!

Share নাঙ্গলকোট উপজেলার একটি পৌরসভা ও ১৬টি ইউনিয়ন, নবগঠিত লালমাই উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন ও কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন নিয়ে কুমিল্লা-১০ আসন। আয়তন ও জনসংখ্যার দিক থেকে দেশের অন্যতম বড় আসন এটি। আসনের প্রতিটি ...