আজ : বৃহস্পতিবার, ৩রা কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১৮ই অক্টোবর, ২০১৮ ইং, ৭ই সফর, ১৪৪০ হিজরী, ভোর ৫:২২,

ক্রীড়া সাংবাদিকতা— রবিউল ইসলাম বিদ্যুৎ

images্ররবিউল ইসলাম বিদ্যুৎ: দিন যত যাচ্ছে বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমের পরিধি তত বাড়ছে। শুধু বাড়ছেই না প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ায় গত কয়েক বছরে বিপ্লব ঘটেছে। ঢাকা থেকে অসংখ্য সংবাদপত্র বের হচ্ছে প্রতিদিন। কম নয় টেলিভিশনের সংখ্যাও। এক সময় ধারণা করা হয়েছিল দেশে এতো ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ার প্রসারে গ্রহণযোগ্যতা কমে যেতে পারে প্রিন্ট মিডিয়ার। কিন’ সেটি ভুল প্রমাণিত হয়েছে। মানুষ টেলিভিশন দেখার পাশাপাশি সংবাদপত্রের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন আরও বিশদ জানার জন্য। আর মানুষের এই আগ্রহই এ দেশের তরুণ-তরুণীদের মনে সংবাদ মাধ্যম নিয়ে তৈরি করে দিয়েছে প্রচন্ড কৌতুহল। ঢাকাতে তরুণ-তরুণীদের একটি অংশ এই পেশায় আসতে রীতিমতো হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। এই জায়গাগুলোতে অগ্রাধিকার পাচ্ছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র-ছাত্রীরা। এটাও ঠিক যে, আপনার যদি এই পেশার প্রতি ভালবাসা, প্রবল ইচ্ছা এবং পরিশ্রম করার মানসিকতা থাকে তাহলে আপনিও হতে পারবেন ঢাকার সংবাদপত্র কিংবা টেলিভিশনের নামকরা সাংবাদিক।

তবে যারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাঠ শেষ করেছেন তাদের একাডেমিক একটা ধারণা তৈরি হয়েই থাকে। আর আপনাকে শুরু করতে হবে ক, খ থেকে। এটা মনে করে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। কারণ মনে রাখতে হবে সাংবাদিকতা একটি সৃজনশীল কাজ। সাংবাদিকতা বিভাগে না পড়েও এদেশে অনেক বড় বড় সাংবাদিক আছে। তারাই আপনার চলার পথে বড় অনুপ্রেরণা। বড় কথা হলো এই পেশার প্রতি আপনার আগ্রহ আছে কি-না? বড় কিছু না করা অব্দি হাল ছাড়া যাবে না। লেগে থাকতে হবে সবসময়। দেখবেন সাফল্য একসময় আপনার পায়ের নিচে লুটোপুটি খাচ্ছে।

এইচএসসি পাশের পর যেমন যে যার পছন্দ মতো বিষয় বেছে নেন, ঠিক তেমনি সাংবাদিকতার মৌলিক বিষয় জেনে বেছে নিতে পারেন প্রিয় বিষয়টি। একজন ক্রীড়া সাংবাদিক হওয়ায় আমি এখানে স্বল্পপরিসরে বাংলাদেশের ক্রীড়া এবং ক্রীড়া সাংবাদিকতার বিষয়টি তুলে ধরার চেষ্টা করব। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিশ্ব মানচিত্রে ঢুকে পড়েছিল ছোট্ট এই ব-দ্বীপটি। কিন’ স্বাধীনতার ৪২ বছরে বাংলাদেশের যে জায়গায় পৌঁছার কথা ছিল সেখানে পৌঁছতে পারেনি। বরং অবনমন ঘটেছে। বিশ্ব সংবাদ মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিবাচক খবরের চেয়ে নেতিবাচক খবরগুলোই বেশি জায়গা পায়। এক সময় বিশ্বের দুই তৃতীয়াংশ পাট উৎপাদন হতো বাংলাদেশে। এদেশের পরিচয় ছিল সোনালী আঁশের দেশ হিসেবে। কালের আবর্তে সেই সোনালী আঁশ বিলুপ্তির পথে। বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশের পরিচয় যেন অভাব-অনটন আর দারিদ্রর প্রামাণ্যচিত্র। সেখানে একটি খেলা বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। ক্রিকেট বিশ্ব বাংলাদেশকে চেনে লড়াকু দেশ হিসেবে। এদেশে ক্রিকেট বিপস্নব হয়েছিল ১৯৯৭ সালে মালয়েশিয়ায় আইসিসি ট্রফি জয়ের পর। এরপর ১৯৯৯ সালে ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে পাকিসত্মানকে হারিয়ে বাংলাদেশ জানান দেয় তারা ক্রিকেটে থাকতেই এসেছে।  বছরখানেক পরই ক্রিকেটের কুলীন পরিবারের সদস্য অর্থাৎ টেস্ট মর্যাদা পায় বাংলাদেশ। বিশ্বের যে ১০টি দেশ টেস্ট খেলে এরমধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।

ক্রিকেট এখন আর নিছক একটি খেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বাঙালী জাতীর আবেগের নামও। ক্রিকেট আমাদের বাধভাঙা আনন্দের উপলড়্গ এনে দেয়। কুলষিত রাজনীতি মানুষের মাঝে তৈরি করেছে মতানৈক্য। কোন বিষয়েই আমরা একমত হতে পারি না। এখানে ক্রিকেট আশ্চর্যরকমভাবে সবাইকে এক করে ফেলে। ক্রিকেটারদের বিজয়ে আমরা হাঁসি। রাসত্মায় নেমে মিছিল করি, সেস্নাগান তুলি। এই দৃশ্য অন্য কোথাও খুঁজে পাওয়া বিরল।

বাংলাদেশের ক্রিকেট এখন যেখানে পৌঁছছে, ইচ্ছা করলেই বাবা-মা তাদের সনত্মানদের মেডিকেল-বুয়েটের কোচিংয়ে না পাঠিয়ে ক্রিকেট কোচিংয়ে পাঠাতে পারেন। কথাটা অনেকের পছন্দ না হলেও বাসত্মবতা বলছে ক্রিকেটে টাকা উড়ছে। নিশ্চিনত্ম মনে ক্রিকেটকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া যেতে পারে। কেউ যদি জাতীয় দলে সুযোগ নাও পায় শুধুমাত্র ঘরোয়া ক্রিকেট খেলেও উপার্জন করতে পারেন কোটি কোটি টাকা। শুধু কী ক্রিকেটারই, ক্রিকেট থেকে রাজস্ব বাড়ছে দেশেরও। এই ক্রিকেটের বদৌলতে বাংলাদেশের ক্রীড়া সাংবাদিকতা পেয়েছে ভিন্ন মাত্রা। ক্রীড়া সাংবাদিকতায় আগ্রহ বাড়ছে তরম্নণদের। মাঠে খেলে এগারো ক্রিকেটার, মাঠের বাইরে সেই খেলাকেই কাগজের পাতায় জীবনত্ম করে সারাদেশে ছড়িয়ে দেয় ক্রীড়া সাংবাদিকেরা।

খেলোয়াড়রা যেমন মাঠে নিজেদের নিংড়ে দেন একজন ক্রীড়া সাংবাদিককেও খেলাটাকে হৃদয়ে ধারণ করতে হয়। মাঠে বসে খেলা দেখার অভ্যাস তৈরি করতে হবে। এখান থেকে আপনি লেখালেখির রসদ জোগাড় করতে পারবেন। আসেত্ম আসেত্ম খেলাটার গভীরে ঢুকতে হয়, নিজের ভিতরে তৈরি করতে হয় বিশেস্নষণ করার ড়্গমতাও। ক্রীড়া সাংবাদিকতায় ভাল করতে হলে ইংরেজিতে দড়্গ হতে হবে। ভাল ইংরেজি না জানলে আনত্মর্জাতিক ম্যাচগুলোতে সমস্যায় পড়তে হবে। এজন্য প্রতিদিন বাংলা পত্রিকা পড়ার পাশাপাশি অনত্মত একটি ইংরেজি পত্রিকা পড়ার অভ্যাস করা জরম্নরি। আর নিজের লেখা ভাল করতে হলে আপনাকে বিভিন্ন ধরণের বই পড়তে হবে। বই আপনার চিনত্মা-চেতনাকে বিকশিত করতে সাহায্য করবে।

ক্রীড়া সাংবাদিক হওয়ার পিছনে যে জিনিসটি সবচেয়ে বেশি জরম্নরি সেটি হলো আপনার ক্রীড়া মানসিকতা। একই সঙ্গে খেলাটির খুটিনাটি বিষয়গুলোও জানতে হবে।

ক্রিকেট কিংবা ফুটবলের আনত্মর্জাতিক রেকর্ডগুলো মনে রাখার চেষ্টা করতে হবে। কারণ আপনার লেখার স্বার্থেই এগুলোর দরকার পড়বে। যদিও ইন্টারনেটের এই যুগে মুহূর্তেই বের করে ফেলা যায় যাবতীয় রেকর্ড। তারপরও একজন ক্রীড়া সাংবাদিক হিসেবে রেকর্ডগুলো জেনে রাখা ভাল।

বাংলাদেশের সংবাদপত্রে এবং টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে ক্রীড়ার গুরম্নত্ব কতখানি তা প্রতিদিনের সংবাদপত্র এবং টেলিভিশন চ্যানেলগুলো দেখলেই বোঝা যায়। ঢাকা থেকে প্রতিদিন বড় বড় যে সংবাদপত্রগুলি বের হয় তার দুই পৃষ্টাজুড়ে থাকে খেলার খবর। একটি পত্রিকায় তো খেলার খবরই চারপৃষ্ঠে জুড়ে। শুধু তাই নয়, সপ্তাহে একদিন পত্রিকাগুলো বের করে বিশেষ সংখ্যাও। এখান থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় সংবাদপত্রে ক্রীড়ার গুরম্নত্ব কতটুকু। এ তো গেল সংবাদপত্রের কথা। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোও প্রতিদিন ক্রীড়ার জন্য তৈরি করে আলাদা অনুষ্ঠান। সুতরাং সংবাদপত্র এবং টেলিভিশনে দুই মাধ্যমেই ক্রীড়ার যথেষ্ট গুরম্নত্ব রয়েছে। নিজেকে দড়্গ হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে এই দুই মাধ্যমেই রয়েছে কাজের সুযোগ। আর সে জন্য চাই একাগ্রতা,নিষ্ঠা এবং পরিশ্রম করার মানসিকতা।

সাংবাদিকতার এত বিষয় থাকতে আপনি কেন ক্রীড়া বেছে নেবেন? আমি আগেই বলেছি এ পেশায় আসতে হলে আপনাকে ক্রীড়া মানসিকতার হতে হবে। যদি কারও এই মানসিকতা না থাকে তাহলে ক্রীড়া সাংবাদিকতায় না আসাই ভাল। আগেকার দিনে মানুষ শখের বশে সাংবাদিকতা করতো। এখন সেদিন আর নেই। সেভাবে নিজেকে তৈরি করতে পারলে বড় বড় মিডিয়া হাউজগুলো একজন ক্রীড়া সাংবাদিকের পিছনে মোটা অঙ্কের অর্থ ঢালতেও রাজি। এবং তাই করছেও। এ তো গেল টাকা-পয়সার হিসাব নিকাষ, আপনার সামনে সুযোগ আসতে পারে দেশের বাইরে ভ্রমণেরও। একবার ভাবুন তো আপনি বাংলাদেশ ক্রিকেট দল কিংবা ফুটবল দলের ম্যাচ দেশের বাইরে গিয়ে কভার করছেন! আপনার পাঠানো প্রতিবেদন ছাপানো হচ্ছে কিংবা টেলিভিশনে আপনার প্রতিবেদন দেখানো হচ্ছে। কী রোমাঞ্চকর ব্যাপার, তাই না? হয়তো ভাবছেন আমাকে দিয়ে কী এটা সম্ভব! তাহলে এই অসম্ভব কাজগুলো কে করছে? আপনার মতোই কেউ না কেউ তো করছে। তারা যদি পারে তাহলে আপনি পারবেন না কেন? আপনি যদি পরিশ্রমী আর উদ্যোমী হন তাহলে স্বপ্ন দেখতে সমস্যা কোথায়।

 

লেখক পরিচিতি: রবিউল ইসলাম বিদ্যুৎ

সাবেক ক্রীড়া সাংবাদিক, সমকাল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

কুমিল্লাকে দ্রুততম সময়ে বিভাগ করার জোর দাবি

Share রিকু আমির : নামকরণ যা-ই হোক, কুমিল্লাকে দ্রুততম সময়ে বিভাগ করার জোর দাবি উঠেছে বৃহত্তর কুমিল্লা (কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া-চাঁদপুর) সাংবাদিক ফোরাম আয়োজিত একটি সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠান থেকে। গত রোববার বিকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে বৃহত্তর কুমিল্লা অঞ্চলের প্রয়াত ...

খুলনায় নির্ভার আ.লীগ, শঙ্কায় বিএনপি!

Share খুলনা সিটি নির্বাচন কাল ২৩৪ কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ ভোট ডাকাতি ও নাশকতার পাল্টাপাল্টি অভিযোগ বিএনপির দেড় শ নেতা কর্মী গ্রেপ্তার বলে দাবি নগরীতে নেমেছে ১৬ প্লাটুন বিজিবি প্রচারণা শেষ। রাত পোহালেই ভোট। খুলনা সিটি নির্বাচনে ...