আজ : বৃহস্পতিবার, ৮ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ২২শে নভেম্বর, ২০১৮ ইং, ১৩ই রবিউল-আউয়াল, ১৪৪০ হিজরী, বিকাল ৫:৩০,

ক্রমেই বেরিয়ে আসছে এমপি লিটন হত্যার চাঞ্চল্যকর তথ্য

ক্রমেই বেরিয়ে আসছে এমপি মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন হত্যার চাঞ্চল্যকর কাহিনী। বহুল আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হওয়ার পরপরই স্থানীয় আওয়ামী লীগ, নিহতের পরিবার জামায়াত-শিবিরকে দায়ী করে বক্তব্য দেয়। পুলিশ প্রশাসনও একই ধরনের বক্তব্য দিয়ে আসছিল। কিন্তু ঘটনাটির তদন্তে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
liton
এরই মধ্যে হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী এবং জড়িতদের গ্রেপ্তার করেছে বলে দাবি করেছে পুলিশ। এর মাধ্যমে দেড় মাসের মাথায় হত্যাকাণ্ডের মোটিভ ভিন্ন দিকে মোড় নিল।

মঙ্গলবার বগুড়া থেকে গ্রেপ্তারের পর গাইবান্ধা পুলিশ দাবি করে সাবেক এমপি কর্ণেল (অব.) ডা. আব্দুর কাদের খান শুধু এমপি লিটনকেই নয়, টার্গেট করেছিলেন ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারিকে। এই দুইজনকে সরিয়ে দিতে পারলে ভবিষ্যতে আর রাজনীতির পথে কোনো বাধাই থাকবে না।

পুলিশের দাবি, লিটনকে হত্যার জন্য কাদের খান ৭ লাখ টাকায় তিন খুনি ভাড়া করেন। এই খুনিরা আবার তার সহযোগী। এদের মধ্যে মেহেদী ও শাহীন গ্রেপ্তার হয়েছে। মঙ্গলবার এরা দু’জন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে। আরেক খুনি রানা পলাতক রয়েছে। স্বীকারোক্তিতে তারা খুনের আদ্যপান্ত বর্ণনা করেছে। এমনকি সুন্দরগঞ্জ উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি শামীমকে হত্যার পরিকল্পনা সম্পর্কেও বলেছে ওই দুই জন।

পুলিশ জানায়, এই খুনিদের সহযোগিতা করেন কাদের খানের গাড়িচালক আবদুল হান্নান। গত বৃহস্পতিবার হান্নানসহ কাদের খানের সুন্দরগঞ্জের বাসার তত্ত্বাবধায়ক শামিম হোসেন এবং দু’জন কর্মীকেও আটক করে গাইবান্ধা পুলিশ। জব্দ করা হয় কাদের খানের মোবাইল ফোনটি। হান্নানও আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি দিয়ে পুরো ঘটনা বলেছে।

তদন্তকারীরা বলছেন, খুনিদের সঙ্গে কাদের খানের টেলিফোনে কথোপোকথনের অডিও রেকর্ডও আছে পুলিশের হাতে। এছাড়া মোবাইল ফোনের কললিষ্টসহ বিভিন্ন ধরনের আলামতও আছে। পুলিশ খুনিদের ব্যবহার করা অস্ত্র, গুলি ও মটরসাইকেল উদ্ধার করেছে। এই হত্যাকান্ডে আব্দুল কাদের খানের সম্পৃক্ততার পুরো আলামত এখন পুলিশের হাতে। খুনিরা টাকা নিয়ে কি করেছে সে তথ্যও পেয়েছে পুলিশ। একজন খুনি জমি বন্দক রেখেছে, আরেকজন বন্ধুকে ধার দিয়েছিল। পুলিশ এই টাকাও ইতিমধ্যে উদ্ধার করেছে। এ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ভিডিও রয়েছে পুলিশের হাতে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শুধু সরিয়ে দেয়া নয়, নানা কারণেই লিটনের উপর বিরক্ত ছিলেন কাদের খান। ২০০৮ সালে মহাজোট থেকে নির্বাচন করে এমপি হয়েছিলেন কাদের খান। এরপর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি হন লিটন। তিনি নির্বাচিত হয়েই কাদের খানের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দেন। দুদক এ নিয়ে তদন্ত শুরু করে বলেও এলাকায় খবর চাউর রয়েছে।’

প্রায় এক সপ্তাহ ধরে নজরবন্দি করে রাখা হয় কাদের খানকে। মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে তাকে গ্রেপ্তার করে গাইবান্ধা জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। এ সময় বগুড়ার গোয়েন্দা কর্মকর্তারাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

বগুড়া শহরের মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের পূর্ব পাশে রহমাননগর জিলাদারপাড়া এলাকায় অবস্থিত কাদের খানের মালিকানাধীন গরীব শাহ ক্লিনিক এবং বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে থানায় নেয়া হয়। ক্লিনিকের চারতলায় সপরিবারে বসবাস করেন জাতীয় পার্টি নেতা ডা. কাদের খান । তার স্ত্রী জে ইউ নাসিমা একজন চিকিৎসক। এর আগে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে পুলিশ বাড়িটিকে ঘিরে কার্যত তাকে নজরবন্দি করে রেখেছিল।

কাদের খানকে গ্রেপ্তারের পরপরই প্রথমে বগুড়া জেলা গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর সেখান থেকে তাকে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে নিয়ে যায় পুলিশ। এদিকে তাকে গ্রেপ্তারের পরই তার বগুড়া শহরের বাড়িতে ব্যাপক তল্লাশি চালায় গাইবান্ধা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একটি টিম।

সুন্দরগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আতিয়ার রহমান জানান, লিটন হত্যা মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে কাদের খানকে গ্রেপ্তার করে বগুড়া থেকে তাকে সুন্দরগঞ্জ থানায় আনা হয়েছে। বুধবার তাকে প্রাথমিক জিজ্ঞাবাদ এবং এমপি লিটন হত্যা মামলায় তাকে আদালতে সোপর্দ করা হবে বলেও জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।

জাতীয় পার্টির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ডা. আব্দুল কাদের খান ২০০৮ সালে গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনে মহাজোট থেকে মনোনয়ন পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতা মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় গাইবান্ধা-১ আসনের এমপি নির্বাচিত হন। ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন খুন হলে ওই আসনটি শূণ্য ঘোষণা করা হয়। এরই মধ্যে ওই আসনের উপ-নির্বাচনের তফশিল ঘোষণা করা হয়েছে এবং আগামী ২২ মার্চ ভোট গ্রহণ হবে। এই নির্বাচনে জাতীয় পার্টি নেতা আব্দুল কাদের খানও মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন। তবে ওই আসনে জাতীয় পার্টি থেকে দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও জাতীয় পার্টিতে রওশন এরশাদের অনুসারী হিসেবে পরিচিত আব্দুল কাদের খান নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে প্রথমে রাজি হননি। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে ভেতরে ভেতরে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তবে ১৯ ফেব্রুয়ারি মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন তিনি মনোনয়ন জমা দেননি।

পুলিশ বাড়িটিকে ঘিরে রাখার ফলে তার সমর্থকরা দাবি করেছিল যে, নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে চাপ সৃষ্টির জন্যই তাকে নজরবন্দি করে রাখা হয়েছে। কিন্তু নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণার পরও পুলিশ সরে না যাবার ফলে ঘটনাটি আলোচনায় উঠে আসে। শুরু হয় নানা জল্পনা কল্পনা। অবশেষে সব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে মঙ্গলবার বিকেলে এমপি লিটন হত্যা মামলায় সন্দেভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয় সাবেক এই সংসদ সদস্যকে।

এ বিষয়ে মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক বলেন, ‘এমপি লিটন হত্যার পুরো রহস্যই আমরা উন্মোচন করেছি। এটি একটি রাজনৈতিক হত্যাকান্ড। নিজের আধিপত্য নিরঙ্কুশ করতেই এমপি লিটনকে হত্যার পর আরেক রাজনৈতিক নেতাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন সাবেক এমপি কাদের খান। এর আগেই আমরা তাকে গ্রেপ্তার করেছি। লিটন হত্যার ব্যাপারে কাদের খানের বিরুদ্ধে সব ধরনের তথ্য-উপাত্ত আমাদের হাতে আছে। দুই খুনিকেও আমরা ধরেছি।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

রাজশাহীর মেয়র প্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন!

Share নজরুল ইসলাম তোফা:: রাজশাহীকে বদলে দেয়ার অঙ্গীকার নিয়ে ইতোমধ্যেই ক্ষমতাশীন দলের নেতা এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন সহ অনেক নেতা কর্মীরা মিলিত হয়ে যেন জয়ের হিসাব নিকাশ কষে নির্বাচনী প্রচারণায় চালিয়ে যাচ্ছেন। রাজশাহী মহা ...

নাঙ্গলকোট রাইটার্স এসোসিয়েশনের ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত

Share স্টাফ রির্পোটার: লেখক-সাহিত্যিকদের প্রিয় সংগঠন নাঙ্গলকোট রাইটার্স এসোসিয়েশনের উদ্যোগে লাকসাম পৌরশহরস্থ স্বদেশ রেস্তোরা মিলনায়তনে ইফতার মাহফিল ও দোয়ার আয়োজন অনুষ্ঠিত হলো ১ জুন শুক্রবার। সংগঠনের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আফজাল হোসাইন মিয়াজীর প্রাণবন্ত উপস্থাপনায় ও সংগঠনের ...