আজ : শনিবার, ১লা পৌষ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১৫ই ডিসেম্বর, ২০১৮ ইং, ৭ই রবিউস-সানি, ১৪৪০ হিজরী, দুপুর ১:৪৯,

চিকিৎসা নাগালের বাইরে, দুর্বিষহ জীবন দেড় কোটি কিডনি রোগীর

বিছানা থেকে উঠতে পারছেন না কোনো ভাবেই। কোনো রকমে হাসপাতালের বিছানায় উঠে বসলেন আব্দুস সালাম। পেশায় একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। বয়স আনুমানিক ৪৫।
kidni
প্রায় দেড় বছর ধরে কিডনি রোগে ভুগছেন তিনি। তার দুটি কিডনিই নষ্ট হয়ে গেছে। সংসারের রোজগারের একমাত্র হাতিয়ার তিনি আর তার ছোট দোকানটি। কোনোভাবে সংসার চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি।

কিডনি রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর দিশাহারা আব্দুস সালাম ও তার পরিবার। গলায় পাইপ বসানো আছে। গলার মধ্যে ডায়ালাইসিস করার কারণে কথা বলতে খুব কষ্ট হচ্ছে তার। শরীরে প্রচন্ড রকম পানি। চিকিৎসা নিচ্ছেন রাজধানীর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতালে।

বিশেষায়িত এই হাসপাতালে আরেক রোগী তার পাশের বেডেই চিকিৎসা নিচ্ছেন। যেন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে এই রোগী ইয়াসিন। বয়স ৩৫। তারও দুটি কিডনিই অকেজো। প্রথমে তিনি রাজধানীর ধানমন্ডির বেসরকারি শমরিতা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।

চিকিৎসা ব্যয় বেশি বলে সেখানে পরিবারের পক্ষে তা বহন করা সম্ভব নয়। তার স্ত্রী লুনা বেগম জানান, কিডনি রোগের চিকিৎসার খরচ অনেক। সবার পক্ষে সম্ভব নয়।

শমরিতা হাসপাতালে ৩ থেকে ৪ দিনে তার স্বামীর পিছনে প্রায় ৬০ হাজার টাকার ওপর খরচ হয়েছে। প্রথম দিন ডায়ালাইসিস করতে নিয়েছিল ৩ হাজার ৬০০ টাকা। দ্বিতীয় দিন ৩ হাজার ১০০ টাকা এবং তৃতীয় দিন ৩ হাজার টাকা। সপ্তাহে তিন দিন ডায়ালাইসিস করার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। কিন্তু আমাদের পক্ষে এতো টাকা দেয়া সম্ভব নয়। তাই এখানে নিয়ে এসেছি। কি করবো ভাই আমার স্বামীর জীবন তো বাঁচাতে হবে।

শুধু আব্দুস সালাম নয়, সরকারি হিসেবে ৮ লাখ, আর বেসরকারি সংস্থার হিসেবে বাংলাদেশে প্রায় দেড় কোটি মানুষ কোনো না কোনো কারণে কিডনি রোগে আক্রান্ত। এছাড়া দেশে প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়। প্রতি বছরই এই রোগের রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে বেসরকারি সংস্থাগুলো।

গত এক বছরে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজিতে কিডনি রোগী বৃদ্ধির হার ছিল শতকরা ১৭ ভাগ। বছরে প্রায় ৫৪ হাজার শিশু কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে, যাদের অধিকাংশেরই বয়স ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতি ঘণ্টায় অকাল মৃত্যুবরণ করছে পাঁচ জন। কিডনি ফাউন্ডেশনে একটি কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট করতে প্রায় আড়াই লাখ টাকা খরচ হয়।

কিডনির ক্ষতির প্রধান প্রধান কারণ: প্রতিদিন আমরা এমন অনেক কিছুই করি যা কিডনির জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে উঠতে পারে। পর্যাপ্ত পানি পান না করা, দীর্ঘক্ষণ প্রস্রাব না করে থাকা, বেশি লবণ খাওয়া, ক্যাফেইনে বেশি আসক্তি, ব্যথানাশকের প্রতি নির্ভরশীলতা, বেশি বেশি প্রোটিন খাওয়া, অ্যালকোহলে আসক্তি, ধূমপানে আসক্তি, সর্দি-কাশিকে পাত্তা না দেয়া, রাত জেগে থাকা ইত্যাদি।

ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপালের কিডনি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. এম এ সামাদ এ বিষয়ে জানান, কিডনি বিকলের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল বিধায় এদেশের শতকরা ১০ ভাগ রোগী এই চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারে না। অর্থাভাবে অকালে প্রাণ হারান সিংহভাগ রোগী।

তিনি আরো বলেন, একটু সচেতন হলে ৫০ থেকে ৬০ ভাগ ক্ষেত্রে কিডনি বিকল প্রতিরোধ করা সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন প্রাথমিক অবস্থায় কিডনি রোগের উপস্থিতি ও এর কারণ শনাক্ত করে তার চিকিৎসা করা। স্বাস্থ্যসম্মত লাইফ স্টাইল শিশুকাল থেকে বৃদ্ধকাল পর্যন্ত মেনে চলা। শুধু লাইফ স্টাইল পরিবর্তন করে ৬৮ শতাংশ মৃত্যু ঝুঁকি কমানো সম্ভব। এসব লাইফ স্টাইল হলো প্রধানত প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ মিনিট হাঁটা, পর্যাপ্ত ফলমূল ও শাকসবজি খাওয়া, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা ও ধূমপান মুক্ত থাকা।

কিডনি ফাউন্ডেশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন অর রশিদ সমপ্রতি কিডনি রোগ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছিলেন, গ্রামপর্যায়ের প্রাইমারি হেলথকেয়ার সেন্টারগুলোতে কিডনি, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগসহ জটিল রোগের স্ক্রিনিং ও পরীক্ষার ব্যবস্থা চালু করতে পারলে, প্রাথমিকপর্যায়ে চিকিৎসা করিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই জটিল রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

এ প্রসঙ্গে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি-এর পরিচালক অধ্যাপক ডা. নুরুল হুদা লেলিন বলেন, শিশুদের জন্মগতভাবে কিডনি সমস্যা হয়। এটা প্রথমেই চিহ্নিত করে অপারেশন করলে ভালো হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ বুলেটিন ও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজির পরিসংখ্যান মতে, ২০১৫ সালে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫ হাজার ৭৪৪ জন রোগী। জরুরি ও বহির্বিভাগে দিয়ে সেবা নিয়েছেন ৭৯ হাজার ৮৬১ জন। পুরুষ ৪৫ হাজার ৫৭৮ জন, নারী ২৪ হাজার ৯৭৯ জন এবং শিশু ৪ হাজার ৬ জন সেবা নেন। মারা গেছেন ১৮৯ জন।

তার আগের বছর ২০১৪ সালে এই সংখ্যা ছিল হাসপাতালে ভর্তির ক্ষেত্রে ৫ হাজার ৫৫৩ জন। জরুরি ও বহির্বিভাগ দিয়ে সেবা নেয়ার রোগীর সংখ্যা ৬৮ হাজার ৪৪৩ জন। পুরুষ ৩৯ হাজার ৯৫৪ জন, নারী ১৮ হাজার ৭৭৬ জন এবং শিশু ৩ হাজার ৪৫৫ জন। মারা গেছেন ২০৬ জন।

২০১৩ সালের চিত্রে দেখা যায়, হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪ হাজার ৭৪১ জন। বহির্বিভাগ দিয়ে সেবা নিয়েছেন ৬১ হাজার ৭৮২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৩৯ হাজার ৬০ জন, নারী ১৯ হাজার ২৬১ জন এবং শিশু ৩ হাজার ৪৬১ জন। মারা গেছেন ১৭৬ জন।

সূত্র মতে, হাসপাতালটিতে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ৮ হাজার ১৮৩ জন এবং ফেব্রুয়ারি মাসে ৮ হাজার ৮২৭ জন কিডনি রোগী সেবা নিয়েছেন।

গত এক বছরে বিশেষায়িত এই হাসপাতালটিতে কিডনি রোগীর বৃদ্ধির হার ছিল শতকরা ১৭ ভাগ। ২৫ থেকে ৫০ বছর বয়সের রোগী বেশি আসছে। ১৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে প্রতি দিন ভর্তি হন ১৫ থেকে ২০ জন রোগী। আর গড়ে দৈনিক সেবা নেন ৩শ’র উপরে। শিডিউল রোগীদের জন্য ৬ মাস পর্যন্ত ২০ হাজার টাকা দিয়ে ডায়ালাইসিস করা হয়। আর অন্য রোগীদের প্রতিদিন ৩০০ টাকা দিয়ে ডায়ালাইসিস করতে হয়, সপ্তাহে তিন বা চার দিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

পানি বেশি খেলেও বিপদ!

Share বলা হয়ে থাকে পানির অপর নাম জীবন। তবে পানি কম খেলে শরীরের ক্ষতি হয় এ কথা সবারই জানা রয়েছে। কিন্তু এর উল্টোটাও সত্যি। বেশি পানি খাওয়াও ভাল নয়। কিডনি, হার্টের ওপর চাপ বাড়বে। রক্তে ...

প্রতিদিন সাত ঘণ্টার কম ঘুমালেই বিপদ

Share প্রতিদিন সাত ঘণ্টার কম ঘুমানো মানেই ঘোর বিপদ। ঘুমের মধ্যেই ঘটতে পারে হার্ট অ্যাটাক। এমনকী মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। অনিয়মিত জীবনযাজপনে শরীরের দফারফা হবেই। আর পর্যাপ্ত ঘুম না হলে তো মারাত্মক বিপদ। কম ঘুম ...