আজ : রবিবার, ২রা পৌষ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১৬ই ডিসেম্বর, ২০১৮ ইং, ৮ই রবিউস-সানি, ১৪৪০ হিজরী, বিকাল ৩:১৬,

‘আমি প্রতিদিন ওদের গণনির্যাতনের শিকার হচ্ছি, আমাকে বাঁচাও’

‘আমি প্রতিদিন ওদের গণনির্যাতনের শিকার হচ্ছি, আমাকে বাঁচাও’ সৌদি আরব থেকে ফোনে বাংলাদেশে স্বামীর কাছে এইরকম আকুতি করেছেন ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার এক নারী।
nirjaton
সৌদি আরবে যাওয়ার ২৬ দিন পর স্বামীর কাছে তার এই ফোন আসে।

স্বামী তাকে পরামর্শ দেন পুলিশকে জানাতে। সৌদি পুলিশের দ্বারস্থ হয়েও মুক্তি মেলেনি ওই নারীর। উল্টো ১৫ দিন ধরে স্বামীর সঙ্গে তার যোগাযোগ বন্ধ।

নান্দাইল উপজেলার বাসিন্দা দিনমজুর স্বামী জানান, প্রায় ১৭ বছর আগে বিয়ে করা সংসারে তাদের দুই ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। ঢাকায় একটি রড সিমেন্টের দোকানে কাজ করতেন তিনি। বছর পাঁচেক আগে রড বহন করার সময় এক দুর্ঘটনায় তিনি গুরুতর আহত হয়ে বাড়িতে চলে আসেন। বাঁ কাঁধ ভেঙে যাওয়ায় কর্মহীন হয়ে পড়েন তিনি।

কিছুদিন পর তার স্ত্রী দুই ছেলেকে নিয়ে নরসিংদী চলে যান। সেখানে ছেলেরা রিকশা চালায় আর স্ত্রী একটি সুতার কারখানায় কাজ নেন। তাদের আয়ের একটা অংশ দিয়ে নান্দাইলে গ্রামের বাড়িতে দুই মেয়ে ও বৃদ্ধ মাকে নিয়ে থাকতেন ওই দিনমজুর।

গত বছরের নভেম্বরে স্ত্রী তাকে জানান, নরসিংদীর বেশ কয়েকজন নারীর সঙ্গে তিনি সৌদি আরবে যাবেন কাজ করতে। তার কোনো টাকা লাগবে না। সবকিছু বহন করবে সেখানকার এক লোক। বেতন হবে মাসে ২০ হাজার টাকা। স্বামী তাতে সম্মতি না দিলেও স্ত্রী পাড়ি জমান সৌদি আরব।

সেখান থেকে গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর মোবাইল ফোনে স্বামীকে জানান, তাকে চার তলার একটি ভবনের নিচতলায় আটকে রাখা হয়েছে। স্থানীয় সময় বিকেল চারটা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তার ওপর চলে গণনির্যাতন। মালিক যাওয়ার সময় বাইরে থেকে তালা ঝুলিয়ে দেন।

স্ত্রী তাকে আরো বলেন, ‘কোনো প্রতিবাদ করলে চলে নির্যাতন। আমাকে এই গজবের হাত থেকে নিয়ে যাও। আমি বাঁচতে চাই।’ স্ত্রীর এ আকুতিতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়া স্বামী জানান, এর এক সপ্তাহ পর একজনের পরামর্শে তিনি স্ত্রীকে বলেছিলেন বন্দিদশা থেকে ছুটে গিয়ে পুলিশের কাছে আশ্রয় নিতে।

একদিন ওই নারী কৌশলে বের হয়ে গেলে তাকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। পরে দেশে ফেরত পাঠানোর প্রস্তুতির সময় কথিত মালিক তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে যান। এরপর থেকে স্ত্রীর সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে পারছেন না তিনি। স্ত্রী বেঁচে আছেন, না মরে গেছেন তাও জানতে পারছেন না।

স্ত্রীকে সৌদি আরব থেকে ফিরিয়ে আনতে পুলিশের কাছে গিয়েও কোনো কাজে আসেনি। দুই ছেলের কাছ থেকে জেনেছেন, ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার শাহজাহান নামের এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে সৌদি আরব পাঠিয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শাহজাহানের বাড়ি ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার লক্ষ্মীগঞ্জ এলাকায়। তবে তিনি বাড়িতে থাকেন কম। ঢাকা ও নরসিংদীতে বেশি সময় কাটে তার। তার ভাই কবিরাজ মো. ফজলুল হক বলেন, ‘শাহজাহান দীর্ঘদিন ধরে তার শ্বশুরবাড়ি নরসিংদীর মাধবদীতে বসবাস করছে। সেখানকার লোকজনের সঙ্গে সে ব্যবসা করছেন। তবে কী ব্যবসা করেন তা তিনি জানাতে পারেননি।

পরে শ্রমিক পরিচয়ে শাহজাহানের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে প্রতিবেশী বোনকে সৌদি আরব পাঠানোর আগ্রহ দেখালে তিনি বলেন, ‘নান্দাইলের ওনার (দিনমজুর) ওয়াইফকে তো আমিই পাঠাইছি। কোনো ঝামেলা নাই। যদি ঝামেলা অইতো তা অইলে তো উনিই বলতেন। আমরা চার-পাঁচ শ পাঠাইছি। আপনে একজন কইরা দেইন। আর ওইখানে বয়স চায় ৩০-৩২-এর মধ্যে। আল্লাহওয়ালা লোকদের বাসায় থাকবো। ম্যাডামরারে দেখশোন করবো।’ ঢাকার কাকলী গিয়ে তাকে ফোন দেয়ার পরামর্শ দিয়ে শাহজাহান বলেন, ‘আমি আপনের খোঁজ করবাম।’

খোঁজ নিয়ে আরো জানা যায়, ফয়সাল এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের হয়ে দালালি কাজ করেন শাহজাহান। তার কাছ থেকে নম্বর নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির মালিক মোজাম্মেল হক মুকুলকে ফোন করলে তিনি দাবি করেন, ‘ওই মহিলা যেসব অভিযোগ করেছেন সব মিথ্যা। তার সঙ্গে আমার গত সপ্তাহেও কথা হয়েছে। তিনি বাঙালি খাবার ছাড়া খেতে পারেন না। এ কারণে ক্ষুব্ধ ছিলেন। তার কাছে মোবাইল ফোন না থাকায় তিনি সাময়িকভাবে যোগাযোগ করতে পারছেন না।’

এদিকে এ ঘটনার পর ওই নারীর স্বামী নান্দাইল থানায় একজনের নাম উল্লেখ করে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।

নান্দাইল থানার ওসি মো. আতাউর রহমান বলেন, ‘দালালদের নাম-পরিচয়, মোবাইল ফোন নম্বরসহ লিখিত অভিযোগ দিলে আমি আইনগত ব্যবস্থা নেব।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

বাংলাদেশি কুরআনে হাফেজ সাকিবের বিশ্ব জয়

Share সৌদি আরবের মক্কা নগরীর হারাম শরিফে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছেনে বাংলাদেশের ময়মনসিংহের হাফেজ নাজমুস সাকিব। সারা বিশ্বের ৭০টি দেশের প্রতিযোগীরা ওই জাকজমকপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল। প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়ে কাবা শরীফের ...

সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশি যুবক নিহত

Share সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় কক্সবাজার সদর উপজেলার এক যুবক নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। মঙ্গলবার এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতের নাম রমজান আলী (২৯)। তিনি কক্সবাজার উপজেলার চৌফলদন্ডী ইউনিয়নের পূর্ব নতুন মহাল এলাকার মৃত আবদুল ...