আজ : শনিবার, ৫ই শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২০শে জুলাই, ২০১৯ ইং, ১৬ই জিলক্বদ, ১৪৪০ হিজরী, সকাল ৯:৪২,

কী হবে আগামী নির্বাচনে?

ভয় পাচ্ছেন তারা। এমনকি কথা বলতে এবং মত প্রকাশেও। সারাক্ষণ কাটছে অজানা আতঙ্কে। এই ভয় নিজের জন্য, আত্মজের জন্য, নিকটজনের জন্য, সর্বোপরি বেঁচে থাকার জন্য।
police
সাধারণদের সাথে আলাপচারিতায় একবাক্যে বলেছেন, তাদের কোন অধিকার নেই। অপরাধীদের বিচার নেই। রাতে রিক্সা-গাড়ি চালাতে ভয় লাগে। ছিনতাইকারী, আততায়ী চারিদিকে। পুলিশ তাদের বন্ধু তো নয়ই, বরং উল্টো। সত্য বলা যাচ্ছে না, মত প্রকাশের অধিকার নেই, অপরাধ ঘটলেই বিরোধী দল বা কথিত জঙ্গীদের কাজ বলে দেয়া হচ্ছে, ইত্যাদি।

এতসব নেতিবাচক কথার মধ্যেও আশার কথা- বেঁচে আছি, দেশ উঠে দাঁড়াচ্ছে আমাদের চেষ্টায় আর বিদেশে আমাদের ভাই-বেরাদরদের পাঠানো টাকায়।

এরমধ্য দিয়ে কমন পারসেপশন হচ্ছে, রাজনীতিহীনতা ও নির্বাচনের নামে নৈরাজ্য। রাষ্ট্র মানুষের মধ্যে স্থায়ী ভয়-আতঙ্ক ঢুকিয়ে দিয়েছে। অতি সাধারনদের এই অনুভূতি দুর করতে রাষ্ট্রের কোনো ন্যায়ানুগ আচরণ বা উদ্যোগ আছে- তা দৃশ্যমান নয়। ভীতির বদলে স্বস্তির পরিবেশ, গুজবের বিপরীতে সত্য ভাষণ শাসক ও রাজনীতিকরা ভুলতে বসেছেন।

বলা হচ্ছে- ষড়যন্ত্র, অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা, সংসদ সদস্যের খুন নিয়ে নানা গুজব, সবটাই ভয়-আতঙ্ক বাড়িয়ে দিয়েছে। এর কতটা সত্য বা বিশ্বাসযোগ্য নয় তাও বোঝা যাচ্ছেনা।
২০১৪ সালের শুরুতে একটি জাতীয় নির্বাচন হয়েছিল। পাঁচ বছর মেয়াদান্তে একটি নির্বাচন হবে সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু এদেশে নির্বাচন হচ্ছে গণতন্ত্র, নির্বাচন হলেই গণতন্ত্র রক্ষা পায়- রাজনৈতিক দলগুলো এটি বিশ্বাস না করলেও, সকলকে তা-ই গেলাতে চায়।

রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করেছে, তা কখনই সুষ্ঠ-অবাধ হয়নি, সর্বজনগ্রহনযোগ্যতা পায়নি। ঐতিহাসিকভাবে এ ভূখন্ডে যে কয়টি সুষ্ঠ নির্বাচন হয়েছে, সেগুলি হয় অন্য সরকারের বা দল নিরপেক্ষ কোন সরকারের অধীনে।

সুতরাং ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি, তাই বলা হচ্ছে-এটি গণতন্ত্র হত্যার দিন। যেন এর আগের দিনগুলিতে সারাদেশে গণতন্ত্র টৈ-টম্বুর ছিল। আর যেহেতু প্রায় ভোটারবিহীন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ গদ্দিনশীন থেকেছে, সে কারনে এটি গণতন্ত্র ও সংবিধান রক্ষার নির্বাচন।

যে দলটি ২০০৮ সালের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন হওয়ার পরে গণতান্ত্রিক বিকাশের পথ রুদ্ধ করতে কালাকানুন, রাষ্ট্রীয় বাহিনী ব্যবহার, সংবিধান সংশোধন থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রীর একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করেছে, তারা সংবিধান এবং গণতন্ত্রের দোহাই পাড়ছে ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে।

দল হিসেবে বিএনপি ২০১৩, ২০১৪, ২০১৫ সালে সংঘটিত নাশকতার দায়ে অভিযুক্ত। হাজার হাজার মামলায় দলের শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যন্ত লক্ষাধিক নেতা-কর্মী আসামী হলেও ঐসব মামলাগুলোর কোন বিচার বা শাস্তি জনগন এখনো দেখেনি। রাজনীতিতে এমন একটি আত্মধ্বংসী ট্রেন্ড শুরু হয়েছে যে, নাশকতা মামলায় অভিযুক্তরা জেলায়- উপজেলায় ক্ষমতাসীন দলে আকছার যোগ দেয়ার সাথে সাথে মামলা থেকে রেহাই পেয়ে যাচ্ছে।

ক্ষমতাসীন দলের সাধারন সম্পাদক এদেরকে ‘হাইব্রিড’ আওয়ামী লীগার বলছেন এবং দলের কেউ কোন অপরাধ করলে এদের ওপরে দায় চাপিয়ে দিয়ে ধামাচাপা দেয়া হচ্ছে।

২০১৫ সালের পর বিএনপি রাজনীতিতে প্রায় নেই। মিডিয়ায় সরব উপস্থিতি আছে। ২০১৬ সালের শুরুতে কাউন্সিল করেছে, পার্টির শীর্ষ নেতৃত্ব খালেদা জিয়া ও তদীয় পুত্র তারেক রহমান কমিটিও তৈরী করেছেন। দলের অভ্যন্তরে কোন্দল চেয়ারপারসনের সাথে নেতা-কর্মীদের দুরত্ব এবং রাজনীতিহীনতায় দলটি গত দুই বছরেও গুছিয়ে উঠতে পারেনি।

সরকারের দমননীতি, মামলা-হামলা, খুন-গুম আতঙ্কে দিশেহারা দলটি অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখায় সদা ব্যস্ত। এজন্য তারা যে কোন সমাবেশ, মিছিল, জনসভা করার ব্যাপারে সরকারের মুখাপেক্ষী। কথা বলা বা মতামত প্রকাশে রাজপথের পরিবর্তে বেছে নিয়েছে ইলেকট্রোনিক গণমাধ্যম।

৫ জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তাদের ভাষায়, গণতন্ত্র হত্যা দিবস পালন করতে গিয়ে পুলিশের কাছে অনুমতি চেয়ে দরখাস্ত করেছিলেন। পুলিশ অনুমতি দেয়নি, পুলিশ অনুমতি দিয়েছিল ঐতিহ্যবাহী ছাত্রলীগকে, যারা গত ৪ জানুয়ারি ঢাকা শহরে জনদুর্ভোগ নামিয়ে এনে তাদের ঐতিহ্য প্রদর্শন করেছেন।

৫ জানুয়ারি ১৬ জেলায় বিএনপির কালো পতাকা মিছিলের মত নিরীহ কর্মসূচি পুলিশের লাঠিপেটা ও ছাত্রলীগের যৌথ হামলার শিকার হয়েছে বলে গণমাধ্যমগুলি জানাচ্ছে। অন্যদিকে, একই দিনে ‘গণতন্ত্র বিজয় দিবস’ পালনে আওয়ামী লীগ নির্বিঘ্ন সমাবেশ করেছে এবং নগরবাসী বিজয়ের ধারাবাহিক যান চলাচলের দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন বলে খবরে প্রকাশ।

৭ জানুয়ারিও বিএনপিকে এমনকি দলীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশের অনুমতি দেয়া হয়নি নাশকতার আশংকায়। গণতন্ত্রহীন, একক কর্তৃত্ববাদী একটি দল হিসেবে প্রায় দশককাল ধরে ক্ষমতার বাইরে বিএনপি ঋজু হয়ে দাঁড়াতে পারছে না।

এর কারন অনেক। যুদ্ধে পরাজয়ের মত শত কারনের একটি হচ্ছে- গুলি ফুরিয়ে গিয়েছিল, তাহলে অন্য কোন কারন আর উল্লেখের প্রয়োজন হয় না। দশককাল পরে ব্যক্তির ইচ্ছাপূরনের নেতিবাচক ধারা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে বিএনপি অনেক বিষয় অমীমাংসিত রেখেই।

কিন্তু ক্ষমতাসীন দলটি পণ করেছে, বিএনপিকে কোন অবস্থায় ইতিবাচক ধারায় ফিরতে দেয়া হবে না। উস্কানি দেবে, সভা-সমাবেশ, মিছিল-জনসেবা, এমনকি রাজপথেও নামতে দেয়া হবে না। নাশকতা, সহিংসতা সৃষ্টি হলে সব দায় বিএনপির ঘাড়ে চাপিয়ে হামলা-মামলার বেড়াজালে আবারো আটকে ফেলা হবে।

রাষ্ট্রপতির সাথে সাক্ষাত এবং নির্বাচন কমিশন গঠনে দফাওয়ারী প্রস্তাব নিয়ে এন্তার আলোচনা-সমালোচনা হতে পারে। নারায়নগঞ্জ সিটি নির্বাচনে হেরে গিয়ে সুক্ষ কারচুপির অভিযোগ নিয়েও সমালোচনা হতে পারে। তাই বলে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলকে বারবার নাশকতা সৃষ্টির অভিযোগ এনে কর্মসূচি পালন করতে না দেয়ার পরিনতি কি খুব শুভ? খানিকটা সাবালক হয়ে ওঠা বিএনপি একের পর এক উস্কানি এড়িয়ে যাচ্ছে বটে, কিন্তু এর মধ্য দিয়ে চরমপন্থাকে পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা দেয়ার দায় ক্ষমতাসীনরা কিভাবে এড়িয়ে যাবে?

তিন. ক্ষমতাসীন দলের মনোজমিনের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে তাদের সাম্প্রতিক বক্তব্যে। কথিত গনতন্ত্রের বিজয় দিবসের বিকেলে ঢাকা উত্তর আওয়ামী লীগের এক সভায় দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ‘ক্যান্টনমেন্ট থেকে সাঁজোয়া গাড়ি এসে আপনাকে ক্ষমতায় বসাবে না’। একই বিকেলে ঢাকা দক্ষিণের সভায় দলের সাধারন সম্পাদক ওবায়দুল কাদের প্রশ্ন রেখেছেন, ‘বিএনপি যদি কোন নির্বাচনে অংশ না নেয় তাহলে কি গণতন্ত্র থেমে থাকবে’? তিনি বিএনপিকে সংঘাতে উস্কানি দেয়ার জন্যও অভিযুক্ত করেছেন।

ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ দুই নেতার বক্তব্য কি কোন মেসেজ দেয়, ইঙ্গিত বহন করে? তাদের বক্তব্যের ফলে জনমনে আরো নেতিবাচক পারসেপশন তৈরী হলে তো বিএনপির দীর্ঘদিনের অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়। কম-বেশি ছয় বছর ধরে বিএনপি একটি অভিযোগের পুনরাবৃত্তি করে আসছে।

তাদের ভাষায়, বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রাখতে সংবিধান সংশোধন থেকে যা কিছু করার দরকার ক্ষমতাসীনরা তা সম্পন্ন করেছেন এবং আগামীতেও সেই ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সৈয়দ আশরাফ ও ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্য কি সেই মেসেজই দিয়েছে?

এসবের উত্তর বা মীমাংসা করতে পারতো রাজপথ। কিন্তু রাজপথে নামার সামর্থ্যই নেই বিএনপির বা সেই সামর্থ্যকে শেষ করে দেয়া হয়েছে। সরকারের কাছে একটু অনুমতি, সহনশীলতা ভিক্ষা করে বেড়াচ্ছে। ক্ষমতায় থাকাকালে যে বিষয়গুলি তারা চর্চা করেছে, প্রতিষ্ঠিত করেছে, শতগুন হয়ে সেসবই এখন বুমেরাং হয়ে দেখা দিয়েছে। তাদের তো মনে থাকার কথা, এই নিকট অতীতে আওয়ামী লীঘ আহুত হরতালের দিন হাওয়া ভবন প্রাঙ্গনে তারেক ও আরাফাতের ক্রিকেট খেলার দৃশ্যটি! অনমনীয় দৃঢ়তা নিয়ে মাজা সোজা করে রাজপথে দাঁড়াতে পারলেই কেবল তারা আশা করতে পারে, সরকার বাধ্য হবে তাদের বক্তব্য শুনতে।

এই মানদন্ড সুষ্ঠ ও অবাধ নির্বাচন নির্বাসনে পাঠিয়ে দিয়েছে। ক্ষমতাসীনদের প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন এবং একক নির্বাচন হয়ে উঠেছে গণতন্ত্র ও সংবিধান রক্ষার মানদন্ড। ক্ষমতার বাইরের রাজনৈতিক দলটি গত নির্বাচন বর্জন করার প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে আগত নির্বাচনে অংশ নিতে একটু স্পেস তৈরীর জন্য করুণা ভিক্ষা করছে। এতসবের মূল কারন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা বা রাষ্ট্র শাসনে জন-অংশগ্রহন নয়, ক্ষমতাই একমাত্র মূখ্য। ক্ষমতায় থাকা এবং যাওয়ার জন্য তারা সংবিধান, গণতন্ত্র এবং জনগণের দোহাই দেয়, আহাজারি করে। কিন্তু তাদের ভাবনায় কোথাওই জনগণ নেই, থাকতেও পারে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

নাঙ্গলকোট রাইটার্স এসোসিয়েশনের পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত

Share স্টাফ রিপোর্টার: কুমিল্লার নাঙ্গলকোট রাইটার্স এসোসিয়েশনের রেজি:, বিজয় দিবস উদযাপন, বাৎসরিক প্রোগ্রাম ও আগামি ২০ নভেম্বর এসোসিয়েশনের ১০ বর্ষে পদার্পন উপলক্ষে পরামর্শ সভা ২ নভেম্বর শুক্রবার বিকাল ৪টায় পৌরসভার রওশন রফিক একাডেমী মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। ...

দ‌ক্ষিণবঙ্গের ঐতিহ্য চুইঝাল!

Share মৃত্যুঞ্জয় রায়, খুলনা: খুলনা বিভাগে চুইঝাল এত জনপ্রিয় যে একে খুলনার কৃষিপণ্য হিসেবে ব্র্যান্ডিং করাই যায়। খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর বাজারে আব্বাসের হোটেল চুইঝাল দিয়ে রান্না করা খাসির মাংসের জন্য বিখ্যাত হয়ে উঠেছে। চুইঝাল-মাংস খুলনার ...